রোমানিয়ায় বাংলাদেশিদের প্রতি বৈষম্য ও অনাস্থা বাড়ছে কেন?

সময়ের আলো ডেস্ক

প্রবাস

ইউরোপে বাংলাদেশি শ্রম অভিবাসন নিয়ে প্রকাশিত এক নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে রোমানিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের বেতনবৈষম্য, সামাজিক অবহেলা ও নানা ধরনের ভোগান্তির

2026-10-22T20:26:11+00:00
2026-10-22T20:27:54+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রবাস
রোমানিয়ায় বাংলাদেশিদের প্রতি বৈষম্য ও অনাস্থা বাড়ছে কেন?
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২৬ পিএম  আপডেট: ২২.১০.২০২৬ ৮:২৭ পিএম
রোমানিয়া। ছবি : সংগৃহীত
ইউরোপে বাংলাদেশি শ্রম অভিবাসন নিয়ে প্রকাশিত এক নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে রোমানিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের বেতনবৈষম্য, সামাজিক অবহেলা ও নানা ধরনের ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোমানিয়ার কিছু নিয়োগকর্তা বাংলাদেশি শ্রমিকদের বদলে নেপালি কর্মীদের নিয়োগে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বাংলাদেশিদের একটি অংশের রোমানিয়াকে ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত ‘ক্যাসল ২’ প্রকল্পের একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তায় কাজ করা এই প্রকল্পের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোমানিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ৯৮ শতাংশই পুরুষ। তাদের অধিকাংশ তরুণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হারও তুলনামূলক কম। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে আইসিএমপিডি, বেবে-বোলিয়াই বিশ্ববিদ্যালয় ও টেরে ডে হোমস।

প্রতিবেদনে রোমানিয়ায় কর্মরত ফাহিম নামে এক বাংলাদেশি অভিবাসীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, একই ধরনের কাজ করেও বাংলাদেশি শ্রমিকেরা রোমানীয় কর্মীদের তুলনায় কম বেতন পান। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বেশি সময় কাজ করেও বাড়তি সুবিধা মেলে না।

ফাহিমের ভাষায়, ‘আমরা একই কাজ করি। কিন্তু তারা আমাদের রোমানিয়ানদের চেয়ে কম বেতন দেয়। আমি পাই ৮০ হাজার টাকা; রোমানিয়ান শ্রমিকরা পায় ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। উল্টো আমি তাদের চেয়ে বেশি কাজ করি। সবাই আমাকে দিয়ে কাজ করায়।’


তার অভিযোগ, বাংলাদেশি শ্রমিকদের দিয়ে বেশি সময় কাজ করানো হলেও এর বিনিময়ে অতিরিক্ত কোনো সুবিধা দেওয়া হয় না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোমানিয়ার নিয়োগকর্তাদের একটি অংশ এখন বাংলাদেশিদের তুলনায় নেপালি শ্রমিকদের নিয়োগে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর পেছনে বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি অংশের রোমানিয়াকে ইউরোপের অন্য দেশে, বিশেষ করে ইতালিতে যাওয়ার মধ্যবর্তী গন্তব্য হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতাকে দায়ী করা হচ্ছে।

ফাহিম বলেন, ‘বাংলাদেশিরা এখানে এলে ইতালি চলে যায়। তারা মনে করে, ইতালি ভালো। কেউ থাকতে চায় না। আমরা ১০০ জন এসেছিলাম। এখন আছি ২০ জন। ৮০ জন চলে গেছে। কেউ অন্য দেশে অবৈধভাবে আছে।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রোমানিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের সামাজিক বৈষম্যের মুখেও পড়তে হচ্ছে। স্কুলে বাংলাদেশি শিশুরা ভাষা ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যানারে ‘এটা বাংলাদেশ নয়’-এমন বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব ছড়ানোর কথাও উঠে এসেছে। এতে অভিবাসীদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও কোণঠাসা হয়ে পড়ার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।

পুরুষদের বিদেশে শ্রম অভিবাসনের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে রেখে আসা পরিবারের ওপরও। স্বামী বিদেশে থাকায় অনেক নারীকে সংসারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সন্তানের পড়াশোনা এবং ঘরবাড়ি নির্মাণসহ নানা দায়িত্ব একাই সামলাতে হচ্ছে।

৩৫ বছর বয়সী হিয়া নামের এক নারী বলেন, ‘আমাকে সংসার চালাতে কাজ করতে হয়।’

তবে, ইউরোপে স্বামী বা পরিবারের সদস্যের বসবাসের কারণে সামাজিক মর্যাদা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। এক নারী জানান, আগে যখন দুবাই বা সৌদি আরবে ছিল, তখন একরকম দেখত। এখন ইউরোপে বলে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সম্মান দেয়।

রোমানিয়ার আবহাওয়াও অনেক বাংলাদেশি অভিবাসীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। ফাহিম বলেন, ‘সূর্য কম ওঠে। শীতকালে বেশিরভাগ সময় অন্ধকার থাকে। রাতে বেশি ঠান্ডা। আমার ভালো লাগে না।’ অন্যদিকে, পর্তুগালের আবহাওয়া বাংলাদেশের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে অনেকেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রোমানিয়ায় ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, নাগরিকত্ব ও পারিবারিক ভিসার মতো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পাশাপাশি রয়েছে উচ্চ ব্যয়, অনিশ্চয়তা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব।

এ ধরনের জটিলতায় পড়ে অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন, দালাল কিংবা ব্রোকারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। এই নির্ভরতার সুযোগে প্রতারণা ও আর্থিক শোষণের ঝুঁকি বাড়ছে। দূতাবাসে যোগাযোগ এবং ভিসার আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে সহজে সঠিক তথ্য না পাওয়ায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশে যাওয়ার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করায় অনেক অভিবাসীর উপার্জনের বড় অংশই ঋণ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে, পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

শুধু বিদেশে যাওয়ার সময়ই নয়, সেখানে অবস্থানকালে বৈধ কাগজপত্র ঠিক রাখা এবং পারমিট নবায়নেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে গ্রিসে বসবাসরত মিজান নামে এক তরুণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, ছয় মাসের একটি ডকুমেন্ট নবায়ন করতে তাকে প্রায় ৬ হাজার ইউরো দিতে হয়েছে।

মিজান বলেন, ‘গত মাসে আমাকে এখানে ছয় মাসের জন্য একটি ডকুমেন্ট নবায়ন করতে হয়েছিল। এই ডকুমেন্ট থাকলে ভ্রমণের সময় পুলিশ কোনো ঝামেলা করে না। আমি সেই ডকুমেন্টের জন্য ফি দিয়েছি প্রায় ৬ হাজার ইউরো।’

অন্যদিকে, ইউরোপে বাসাভাড়া ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি হলেও অনেক অভিবাসীর আয় তুলনামূলক কম। ফলে, মাস শেষে সঞ্চয় করা কিংবা দেশে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। কম আয়, উচ্চ ব্যয় ও ঋণের বোঝা মিলিয়ে অনেক অভিবাসী আর্থিক সংকটের চক্রে আটকে যাচ্ছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসনপ্রক্রিয়ার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দালালদের শোষণ, অতিরিক্ত খরচ ও তথ্যের ঘাটতি বাংলাদেশি অভিবাসী এবং তাদের পরিবারকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজলভ্য করা, আনুষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং গন্তব্য দেশগুলোতে অভিবাসীদের সমাজের সঙ্গে একীভূত করার নীতি জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, অভিবাসীদের কল্যাণকে শুধু রেমিট্যান্সের হিসাব দিয়ে বিবেচনা করলে চলবে না। বিদেশে কর্মরত ব্যক্তিদের পাশাপাশি দেশে রেখে আসা পরিবারের জন্যও আনুষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভিসা ও কাগজপত্রের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রতারণা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে অভিবাসীদের ভোগান্তি, দালালনির্ভরতা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার চক্র অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   রোমানিয়া  বাংলাদেশি  শ্রমিক  অনাস্থা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
প্রবাস- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: