গ্রাফিক : সময়ের আলোকৃষি গবেষণায় উদ্ভাবিত নতুন জাতের বীজ ও উদ্ভিদের সত্ত্ব সুরক্ষা, উদ্ভাবক বিজ্ঞানীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জাতের অননুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে তৈরি ‘উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। বিধিমালাটি কার্যকর হলে নতুন জাতের নিবন্ধন, উদ্ভাবকের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ, আপত্তি নিষ্পত্তি এবং নিবন্ধিত জাতের তথ্য সংরক্ষণে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত বিধিমালা বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের সাংগঠনিক কাঠামোও নির্ধারণ করা হয়েছে। খসড়ায় গ্রেড-১ পদমর্যাদার একজন অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের কথা রয়েছে।
সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত অংশীজনদের নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিধিমালাটির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে ২০১৯ সালে প্রণীত ‘উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন’-এর আওতায় নতুন জাত নিবন্ধন এবং প্রজননবিদের অধিকার সুরক্ষার বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় সেই আইনের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও সুনির্দিষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিধিমালাটির খসড়া অনুযায়ী, উদ্ভিদের জাত নিবন্ধনের জন্য ম্যানুয়াল ও ডিজিটাল— দুই পদ্ধতিতে নিবন্ধন বহি সংরক্ষণ, প্রয়োজনে ডিএনএ ফিঙ্গার প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে জাতের পরিচয় যাচাই এবং নিবন্ধিত জাতের বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুবিধা বণ্টনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আবেদন যাচাই, আপত্তি উত্থাপন, শুনানি এবং নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়াও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত জাতের সত্ত্ব সংরক্ষণে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ, কৃষকদের অধিকার রক্ষা এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় আবেদনকারীর ধরন অনুযায়ী নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। খসড়ার তফসিল-৩ অনুযায়ী, ব্যক্তি পর্যায়ে নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৭ হাজার টাকা এবং বাণিজ্যিক পর্যায়ে ১০ হাজার টাকা। জাতের বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ যাচাইয়ের জন্য মূল্যায়ন ফি পরীক্ষার ধরন ও পরিধি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। প্রতি এন্ট্রির জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রতিনিধি বা এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন ফি ১০ হাজার টাকা এবং সুবিধা বণ্টনের আবেদন ফি ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। নিবন্ধন-সংক্রান্ত আপত্তি বা বিরোধিতার নোটিসের জন্য ফি প্রস্তাব করা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। তবে কৃষক কোনো জাতের নিবন্ধনের বিরুদ্ধে আপত্তি বা বিরোধিতা করলে তার কাছ থেকে ফি নেওয়া যাবে না বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। সময় বাড়ানোর আবেদন করলে প্রতি মাসের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা ফি দেওয়ার বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী নতুন কোনো উদ্ভিদের জাত নিবন্ধনের ক্ষেত্রে তার নতুনত্ব, স্বাতন্ত্র্য, সমরূপতা ও স্থায়িত্ব প্রমাণ করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এনডিইউএস মানদণ্ডের আলোকে জাতটির বৈশিষ্ট্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আধুনিক আণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে ডিএনএ ফিঙ্গার প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে জাতের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য যাচাই করা যাবে।
কোনো আবেদনকৃত জাতের তথ্য নিয়ে অসংগতি দেখা দিলে বা আপত্তি উঠলে কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত পরীক্ষার জন্য নমুনা বিশেষায়িত পরীক্ষাগারে পাঠাতে পারবে। এর মাধ্যমে একটি জাতের প্রকৃত উদ্ভাবক কে, জাতটি অন্য জাতের তুলনায় কতটা স্বতন্ত্র এবং আবেদনে দেওয়া তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য— এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এ জন্য নিবন্ধিত প্রতিটি জাতের তথ্য সংরক্ষণে প্রমিত ম্যানুয়াল ও ডিজিটাল ‘জাত নিবন্ধন বহি’ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এতে নিবন্ধিত জাতের পরিচয়, কারিগরি বৈশিষ্ট্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ করা যাবে। ভবিষ্যতে কোনো জাতের সত্ত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজে আসতে পারে।
কৃষি গবেষণায় নতুন জাত উদ্ভাবনের পেছনে দীর্ঘ সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়। কিন্তু উদ্ভাবিত জাত বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে গবেষক বা মূল উদ্ভাবকের সত্ত্ব ও আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে গবেষণায় উৎসাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ বিবেচনায় প্রস্তাবিত বিধিমালায় ‘সুবিধা বণ্টন’ কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, নিবন্ধিত জাতের বাণিজ্যিক ব্যবহার থেকে উদ্ভূত সুবিধা বা লাভের অংশ বণ্টনের জন্য আবেদন করার ব্যবস্থা থাকবে। এ সংক্রান্ত আবেদনের ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫ হাজার টাকা। একই সঙ্গে কোনো জাত নিবন্ধনের আবেদন জনসাধারণের অবগতির জন্য সরকারি গেজেট ও ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট গবেষক, প্রতিষ্ঠান, কৃষক কিংবা অন্য কোনো স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপত্তি জানাতে পারবেন।
নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আপত্তি ও শুনানির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর জন্য ৯০ দিন এবং উত্থাপিত আপত্তির জবাব ও শুনানির জন্য ৩০ দিন সময় রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া তথ্য, অনিয়ম কিংবা বিধিমালার শর্ত লঙ্ঘনের মাধ্যমে কোনো জাত নিবন্ধিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে ৩০ দিনের নোটিস দেওয়ার পর নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত বিধিমালা বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ’ গঠন করে গ্রেড-১ পদমর্যাদার একজন অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের কথা রয়েছে।
তার অধীনে কৃষি ও কারিগরি, প্রশাসন ও অর্থ এবং সাধারণ সেবা-সংক্রান্ত বিভাগ কাজ করবে। পাশাপাশি উদ্ভিদ প্রজনন, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ ও উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান (রুটিন দায়িত্ব) ড. মো. আবদুছ ছালাম জানান, আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তের আলোকে খসড়া বিধিমালার ওপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছিল। তাদের মতামত অন্তর্ভুক্তিকরণসহ খসড়া বিধিমালা সংশোধন করে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও