শেষের পথে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, সহায়তা না পেয়ে জেলেপল্লিতে হাহাকার
হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০২ এএম
ছবি : সময়ের আলো
নদীতে মাছ ধরা বন্ধ। ঘাটে সারি সারি নোঙর করা মাছ ধরার নৌকা। তীরে তুলে রাখা হয়েছে জাল। কর্মচাঞ্চল্যহীন হয়ে পড়েছে মাছঘাট ও আড়তগুলো। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছেন হাতিয়ার জেলেরা। তবে নিষেধাজ্ঞা শুরুর পরও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন তারা। আয় বন্ধ থাকলেও থেমে নেই সংসারের খরচ। নৌকার কিস্তি, শ্রমিকের মজুরি, খাবার ও পুরোনো দেনার চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলে পরিবারের সদস্যরা।
হাতিয়ার মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগর ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল মৎস্য অর্থনীতি। মৎস অফিসের তথ্য মতে এখানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৪ হাজার। তাদের মধ্যে ১৫ হাজার জেলের জন্য বরাদ্দ এসেছে ২৫ কেজি করে চাল। অথচ উপজেলার ছোট-বড় প্রায় ২০টি মাছঘাটে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার মাছ ধরার নৌকা। এসব নৌকায় কাজ করেন লক্ষাধিক জেলে ও মাঝি-মাল্লা। তাদের পাশাপাশি মাছের আড়তদার, ব্যবসায়ী, বরফকলের শ্রমিক ও পরিবহনকর্মীসহ বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করে মাছ আহরণ ও বিপণনের ওপর। নিষেধাজ্ঞার কারণে পুরো মৎস্য অর্থনীতিতেই স্থবিরতা নেমে এসেছে।
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ০৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মাছ ধরা থেকে বিরত রয়েছেন হাতিয়ার জেলেরা। তবে মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের আইন মেনে চললেও তাদের অনেকেই এখনো সরকারি সহায়তা পাননি। এতে জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
ছবি : সময়ের আলো
উপজেলার সূর্যমুখী ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, পুরো মাছবাজার সুনসান। খালের পাশে তাবু টাঙিয়ে কেউ পুরোনো জাল মেরামত করছেন, কেউ বাঁধছেন নতুন জাল। আবার কেউ নিজেদের ট্রলারের ছোটখাটো মেরামতের কাজ সারছেন। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেই আবার সাগরে নামার প্রস্তুতি তাদের। মাছ ধরে দেনা পরিশোধ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু ভালো থাকার স্বপ্ন দেখছেন তারা।
স্থানীয় জেলে মনির হোসেন বলেন, ‘আয় বন্ধ, কিন্তু খরচ থেমে নেই। পরিবারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নৌকা পরিচালনার খরচ মেটাতে হচ্ছে। মৌসুমের শুরু থেকেই আশানুরূপ মাছ পাইনি। নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ দিকে মাছ কিছুটা বেশি পেলেও সেই আয় দিয়ে পুরোনো দেনা শোধ করা সম্ভব হয়নি। সরকার যে আইন দিয়েছে, আমরা তা মানছি। কিন্তু সরকারি কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে।’
জেলে আকবর হোসেন বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে এ পেশায় আছি। নদীতেই আমাদের জীবন-মরণ। এখনো একটি জেলে কার্ড পাইনি। মৌসুমের শুরুতে তেমন মাছ পাইনি। যখন মাছ পাওয়া শুরু হয়েছে, তখনই সরকার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সরকারের আইন মেনে সাগরে নামিনি। কিন্তু আমার পরিবারে আট থেকে ১০ জন সদস্য। সরকারি কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় খুব কষ্টে দিন কাটছে।’
নবীর উদ্দিন নামে আরেক জেলে বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি অভিযান মেনে চলছি। আমার জেলে কার্ড আছে, কিন্তু এক মুঠো চালও পাইনি। ছয় বছর আগে কার্ড করেছি। এ পর্যন্ত মাত্র দুইবার চাল পেয়েছি। আমরা কীভাবে চলি, আমাদের সংসার কীভাবে চলে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। এখন সহায়তা না পেলে আর কবে পাব?’
ছবি : সময়ের আলো
সূর্যমুখী ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, ‘এই ঘাটে প্রায় দুই হাজার জেলে রয়েছেন। তাদের মধ্যে মাত্র ২৬০ জনের জেলে কার্ড আছে। কার্ডধারীদের মধ্যেও ১০০ থেকে ১২০ জনের মতো চাল পান। সরকার যে আইন করেছে, জেলেরা তা মানছেন। কিন্তু তাদের যে সহযোগিতা পাওয়ার কথা, তা পাচ্ছেন না। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমরা আড়তদাররাও লোকসানে আছি। মাছ ধরার মৌসুমে অভিযান শুরু হওয়ায় জেলেদের কাছে পাওনা টাকা আদায় করতে পারিনি।’
হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান বলেন, ‘হাতিয়ায় লক্ষাধিক জেলের মধ্যে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৪ হাজার ৬০ জন। তাঁদের জন্য বরাদ্দ এসেছে মাত্র ১৫ হাজার জেলের। ইউনিয়নভিত্তিক চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বরাদ্দের তুলনায় জেলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সবাইকে সহায়তা করা সম্ভব হয়নি। তবে অন্যান্য উপজেলার তুলনায় হাতিয়ার জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বরাদ্দ বাড়ানোর চেষ্টা করব।’