বারান্দা থেকে শখের বাগান, তানজিলার মাসিক আয় দুই লাখ টাকা

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি

সারাদেশ

অবসরে গাছের পরিচর্যা করতেন। শখ করে ঘরের বারান্দায় গড়ে তুলেছিলেন ইনডোর প্ল্যান্টের ছোট্ট বাগান। সেই শখই একসময় হয়ে ওঠে জীবিকার

2026-10-24T11:21:12+00:00
2026-10-24T11:28:16+00:00
 
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
বারান্দা থেকে শখের বাগান, তানজিলার মাসিক আয় দুই লাখ টাকা
শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২১ এএম  আপডেট: ২৪.১০.২০২৬ ১১:২৮ এএম
নারী উদ্যোক্তা তানজিলা আখি শখ করে ঘরের বারান্দায় গড়ে তুলেছিলেন ইনডোর প্ল্যান্টের ছোট্ট বাগান। ছবি : সময়ের আলো
অবসরে গাছের পরিচর্যা করতেন। শখ করে ঘরের বারান্দায় গড়ে তুলেছিলেন ইনডোর প্ল্যান্টের ছোট্ট বাগান। সেই শখই একসময় হয়ে ওঠে জীবিকার পথ। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নিজের পরিশ্রম, একাগ্রতা আর পরিবারের সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন ইনডোর প্ল্যান্টের বাগান ‘ওয়ান্ডার গার্ডেন বিডি’ (Wonder Garden BD)। এখন তার বাগানে রয়েছে বিভিন্ন জাতের ইনডোর প্ল্যান্ট। বাগানে থাকা গাছের চারার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা। এ বাগান থেকে মাসে তাঁর আয় প্রায় দুই লাখ টাকা, কোনো কোনো মাসে যা তিন থেকে চার লাখ টাকায়ও পৌঁছায়।

এই নারী উদ্যোক্তার নাম তানজিলা আখি। তার বাড়ি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায়। একসময় ঢাকায় চাকরি করতেন তিনি। ২০১৯ সালের দিকে ঢাকার একটি ডিজাইনার হাউসে কাজ করার সময় গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকে ঘরের বারান্দায় ইনডোর প্ল্যান্টের বাগান গড়ে তোলেন। তখনো ভাবেননি, এই শখই একদিন তার পরিচয়ের বড় অংশ হয়ে উঠবে।

২০২০ সালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন তানজিলা। হোম কোয়ারেন্টিনে তাকে আলাদা একটি ঘরে থাকতে হয়। স্বামী-সন্তানের কাছেও যেতে পারতেন না তিনি। নিঃসঙ্গ সেই সময়ে তার সঙ্গী হয়ে ওঠে বারান্দার গাছগুলো। গাছের পরিচর্যা আর সেগুলোর সঙ্গে সময় কাটানো থেকেই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হয়। ধীরে ধীরে গাছ সংগ্রহের আগ্রহ বাড়তে থাকে।

একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে নিজের সংগ্রহের গাছগুলো নিয়ে স্বামীর কর্মস্থল নরসিংদীতে চলে যান তানজিলা। সেখানে নতুন করে ইনডোর প্ল্যান্টের বাগান গড়ে তোলেন। শখের গণ্ডি পেরিয়ে শুরু করেন পেশাদারভাবে গাছের চারা বিক্রি। বিভিন্ন বৃক্ষমেলায় অংশ নিয়ে ইনডোর প্ল্যান্টের স্টলও দিতেন। এভাবেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে তার ছোট্ট উদ্যোগ।

তবে সেই পথ মসৃণ ছিল না। ২০২৪ সালে নরসিংদীতে ভাড়া বাসায় থাকার সময় বাগান নিয়ে প্রতিবেশীদের আপত্তির মুখে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে স্বামীকে নরসিংদীতে রেখেই নিজের সব গাছ নিয়ে শিবচরে ফিরে আসেন। আবারও শুরু করতে হয় শূন্য থেকে। তবে এবার লক্ষ্য ছিল আরও বড়।


পরিবারের সহযোগিতা আর নিজের নিরলস পরিশ্রমে শিবচরে পারিবারিক আট শতাংশ জমিতে গড়ে তোলেন ‘ওয়ান্ডার গার্ডেন বিডি’। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গাছের সংগ্রহ, ক্রেতার আগ্রহ এবং ব্যবসার পরিধি। অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন তার আয়ের অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে ফিলোডেনড্রন, মনস্টেরা, অ্যাগলোনিমা, সিঙ্গোনিয়াম, বিভিন্ন জাতের থাই লিলি, অর্কিড, ফিটোনিয়া, পারলার পাম, বেগোনিয়া ও পথোসসহ নানা ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট। সব মিলিয়ে এক হাজারের বেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে বলে জানান তানজিলা। তার হিসাব অনুযায়ী, বাগানে থাকা গাছের চারার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা। বর্তমানে তার এই উদ্যোগে কাজ করছেন দুজন কর্মচারী।

নিজের এই পথচলা সম্পর্কে তানজিলা আখি বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর গাছের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সেখান থেকেই গাছ সংগ্রহ শুরু করি। একটু একটু করে গড়ে তুলেছি ওয়ান্ডার গার্ডেন বিডি। ব্যবসা শুরু করার পর নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা এসেছে। সবকিছু অতিক্রম করে এখন নিজের একটি বাগান হয়েছে। এখান থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকার বেশি আয় করছি। আমার এখানে দুজন কর্মচারী আছেন। আগামী মাস থেকে আরও একটি বাগান শুরু করতে যাচ্ছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’

তানজিলার উদ্যোগে গর্বিত স্থানীয় বাসিন্দারাও। প্রতিবেশী মিলন বলেন, ‘তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা। তার পরিচর্যায় এত সুন্দর একটি বাগান গড়ে উঠেছে, এ জন্য আমরা এলাকাবাসী গর্বিত। এত সুন্দর বাগান আগে দেখিনি। একজন নারী হয়েও যেভাবে পরিশ্রম করে তিনি বাগানটি গড়ে তুলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’

আরেক প্রতিবেশী সাজ্জাদ হোসেন খান বলেন, ‘শিবচরের মতো জায়গায় এমন পরিবেশবান্ধব নার্সারি এই প্রথম দেখলাম। নতুন ও পুরোনো উদ্যোক্তাদের সবারই উৎসাহ পাওয়া উচিত। আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই।’

তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলিমুজ্জামান খান বলেন, ‘এ ধরনের তরুণ উদ্যোক্তাদের কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে পাশে থাকবে। শিবচরের অধিকাংশ তরুণ জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমান। এ পরিস্থিতিতে কৃষি ও নার্সারিভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণেরা যাতে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন, সে জন্য তাঁদের সর্বোচ্চ উৎসাহ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’

বারান্দার ছোট্ট বাগান থেকে শুরু করে বড় পরিসরে নার্সারি গড়ে তোলা— তানজিলা আখির এই পথচলা কেবল একজন নারী উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়, বরং প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার উদাহরণ। তার গড়ে তোলা এই সবুজ উদ্যোগ একদিকে যেমন গাছপ্রেমীদের জন্য তৈরি করেছে নানা প্রজাতির ইনডোর প্ল্যান্ট সংগ্রহের সুযোগ, অন্যদিকে তেমনি তাকে দিয়েছে আর্থিক স্বাবলম্বিতা। নিজের পরিশ্রমে গড়ে তোলা এই বাগানকে আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন তানজিলা।


সময়ের আলো/এমকে
  বিষয়:   বারান্দা  শখের বাগান  গাছ  তানজিলা  মাসিক আয়  দুই লাখ 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: