পাঁচ দিনের ছুটিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের ঢল নেমেছে বান্দরবানে। ছবি : সময়ের আলোশঙ্খ নদী, সবুজে ঘেরা উঁচু পাহাড় আর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর ‘পাহাড়ি কন্যা’ বান্দরবান। ১৪টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাসে বৈচিত্র্যময় এই জনপদ পরিচিত সম্প্রীতির জনপদ হিসেবেও। দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের ঢল নেমেছে বান্দরবানে। সাজেকে ভ্রমণে গিয়ে অবরোধের কারণে ভোগান্তিতে পড়া পর্যটকদের একটি অংশও ঘুরতে এসেছেন এ জেলায়।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এবারের পূজার ছুটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছে বান্দরবানে। অথচ পর্যটন মৌসুমে সাধারণত প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার পর্যটক আসেন। পর্যটকদের এমন বাড়তি উপস্থিতিতে হোটেল, মোটেল, রিসোর্টসহ পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানে বেড়েছে ব্যস্ততা।
শুক্রবার বান্দরবানের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে এবং পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে বান্দরবানে এসেছেন অনেকে। সকাল থেকেই নীলাচল, মেঘলা ও শৈলপ্রপাত পর্যটনকেন্দ্রে ছিল পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়। কেউ পাহাড়ের চূড়া থেকে শহর ও আশপাশের সবুজ প্রকৃতি উপভোগ করেছেন, কেউবা দলবেঁধে আড্ডা দিয়েছেন। আবার অনেকে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ছবি তুলে স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করেছেন।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কেওক্রাডংয়ের অবস্থানও এ জেলায়। এ ছাড়া থানচির নাফাখুম ঝরনা, রুমার মুনলাই পাড়াসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে ছুটে গেছেন পর্যটকেরা।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মোহাম্মদ মিজান, কালাম ও আরফাত বলেন, সরকারি ছুটিতে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে তারা বান্দরবানকে বেছে নিয়েছেন। সকালে মোটরসাইকেলে রুমার বগালেক ও কেওক্রাডং ঘুরেছেন। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, চারপাশের সবুজ প্রকৃতি এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জুমচাষ তাদের মুগ্ধ করেছে। বিকেলে নীলাচলের পাহাড়চূড়া থেকে বান্দরবান শহর ও আশপাশের পাহাড়-টিলা দেখে তারা মুগ্ধ হয়েছেন।
রাজশাহী থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা ছোট্ট পর্যটক সারজিত আলম বলেন, পূজার ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে বান্দরবানে এসেছি। সকালে চাঁদের গাড়িতে করে গোল্ডেন টেম্পল, নীলগিরি ও শৈলপ্রপাত ঘুরেছেন। পরে মেঘলা পর্যটনকেন্দ্রে কেবল কার ও নৌকায় চড়েছেন। বিভিন্ন স্থানে ছবি তুলে ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রেখেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদরসহ জেলার সাত উপজেলায় প্রায় তিন শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে প্রায় ২৫ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। কার্তিকের শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে পর্যটকদের এমন ভিড় এ খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বান্দরবান হোটেল-মোটেল মালিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, আগত পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এবার বান্দরবানে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটেছে। করোনার পর এক দিনে এত বেশি পর্যটকের সমাগম এবারই সর্বোচ্চ বলে দাবি করেন তিনি। করোনার আগেও একবার এমন পর্যটকের ভিড় হয়েছিল বলে জানান তিনি। পর্যটক বাড়ায় ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন, পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব পাচ্ছে।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠপর্যায়ে তৎপর রয়েছেন। পর্যটকেরা যাতে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বান্দরবান ভ্রমণ করতে পারেন, সে জন্য পুলিশ ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে।
এদিকে দুর্গাপূজার ছুটির রেশ কাটতে না কাটতেই মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে বা প্রবারণা পূর্ণিমাকে ঘিরে নতুন করে পর্যটক সমাগমের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ফানুস ওড়ানো, পাহাড়জুড়ে আলোকসজ্জার মতো মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এবং ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা আসতে পারেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য চনুমং মারমা বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমায় শত শত উঁচু পাহাড় ফানুসের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে। উৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনে আগামী ২৬ অক্টোবর মূল অনুষ্ঠান ও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এদিন বিহারে পূজা শেষে দায়ক-দায়িকা ও সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে মঙ্গলযাত্রা বের হবে। পরে পাড়া প্রদক্ষিণ করে উজানীপাড়া খেয়াঘাটে শঙ্খ নয়, সাঙ্গু নদীতে রথ বিসর্জন দেওয়া হবে। প্রতিবছরের মতো এবারও হাজারো পর্যটক এ উৎসব উপভোগ করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক নাজনীন সুলতানা বলেন, সরকারি টানা ছুটি ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসবকে ঘিরে বান্দরবানে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় হতে পারে। পর্যটকেরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য জেলার সাত উপজেলার হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। থাকা-খাওয়ার দাম স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সময়ের আলো/এমকে