ছবি : সংগৃহীতটাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা পৌরসভা ও আশপাশের এলাকায় মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কথিত ‘হানি ট্র্যাপ’ বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো গুরুতর অভিযোগ ঘিরে জনমনে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে একটি অপরাধ চক্র এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। অভিযুক্তদের তালিকায় বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এলেও ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ।
সাবেক জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি সুযোগসন্ধানী চক্র বিএনপি’র কতিপয় নেতার নাম ভাঙিয়ে এলেঙ্গা ও আশপাশের এলাকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের জনপ্রতিনিধি ও নেতাকর্মীদের টার্গেট করে।
অভিযোগ রয়েছে, কালিহাতী পৌরসভার মেয়র নুরু নবী সরকার, এলেঙ্গার মেয়র নুর আলম সিদ্দিকীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মামলার ভয় দেখিয়ে ও নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই চক্রের পেছনে স্থানীয় বিএনপি’র এক বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ সহচর ও উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতার ইন্ধন রয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে হোমিও চিকিৎসক দিলীপ চৌধুরীর ঔষধের দোকানে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটলেও আতঙ্কে কেউ প্রতিবাদ করেননি। সম্প্রতি ওই চিকিৎসক নীরবে দেশত্যাগ করেছেন বলেও জানা গেছে। এছাড়া, জোরপূর্বক ব্যাংক চেকের মাধ্যমে টাকা আদায় এবং এক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার আত্মীয়ের ইটভাটা দখলেরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হেনস্তা ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ এলেঙ্গা অঞ্চলের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ের অজুহাতে প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের হেনস্তা করার অভিযোগ সামনে এসেছে।
জানা যায়, এলেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমূল করিমকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার পর কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে পুনরায় স্কুলে সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আরও জানা যায়, সরকারি শামসুল হক কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল কবিরের বাড়ির কাগজপত্রে ত্রুটি ও কলেজের জমি দখলের অভিযোগ তুলে এবং তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
এছাড়াও, শহীদ শাহেদ হাজারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীম আল মামুনের কাছ থেকেও কয়েক লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাঁদাবাজিতে পুরোনো ও নতুন মুখ জমি কেনা-বেচা, নতুন ভবন নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বালু উত্তোলন, মহাসড়ককেন্দ্রিক পরিবহন ও সালিশ-বিচারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অতীতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা এর সঙ্গে জড়িত থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলা বিএনপি’র এক তরুণ নেতা, এক ব্যবসায়ী নেতাসহ রাজবাড়ীর উজ্জ্বল সরকার, হারুনুর রশিদ মিনু, বাঁশীর মামুন, আবু তালেব এবং এলেঙ্গার মকবুল হোসেনের নাম চাঁদাবাজির আলোচনায় এসেছে। তবে অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মাদক কারবার ও পুরোনো সিন্ডিকেট
এলেঙ্গা ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে মাদকের নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। রাজাবাড়ীর উজ্জ্বল সরকার, আব্দুল মান্নান, চিনামুড়ার বর্ণ্যা, ইনছান, শামছুল ও শাহিদা, চেচুয়ার নুরু এবং পাথাইলকান্দির আব্দুল রশিদ ও আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে মাদকের কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এর মধ্যে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট এলেঙ্গার রাজাবাড়ী গ্রামের আব্দুল মান্নানকে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ (আনুমানিক বাজারমূল্য ৩০ লাখ টাকা) গ্রেপ্তার করেছিল টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি দক্ষিণ)। সেসময় কারাবাসের পর এক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির আত্মীয় হওয়ার সুবাদে তিনি বর্তমানে পুনরায় দাপুটে মাদকসম্রাট হয়ে উঠেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
‘হানি ট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেইলিং চক্রের মূল হোতা উজ্জ্বল সরকার!
এলেঙ্গার রাজাবাড়ী এলাকার উজ্জ্বল সরকারকে ঘিরে কথিত হানি ট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, উজ্জ্বল সরকার একদল তরুণীকে ব্যবহার করে একটি হানি ট্র্যাপ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।
উজ্জ্বল এলেঙ্গাসহ ঘাটাইল, মধুপুর ও টাঙ্গাইল শহরে একাধিক ফ্ল্যাট ও আবাসিক হোটেল বুকিং দিয়ে উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন এলাকার সুন্দরী নারীদের দিয়ে এই অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, বিত্তশালী ব্যক্তি, প্রবাসফেরত তরুণ ও সরকারি কর্মকর্তাদের টার্গেট করে ফাঁদে ফেলে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করা হয় এবং তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
এ সংক্রান্ত ৭ মিনিট ৯ সেকেন্ডের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা টাঙ্গাইলের ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়। যদিও ভিডিও ও অডিও ক্লিপটির সত্যতা এবং নিজের কণ্ঠের পরিচয় অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত উজ্জ্বল সরকার। এ বিষয়ে বাঁশীর আলমগীর হোসেনের নামও আলোচনায় এলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাদক, চাঁদাবাজি ও হানি ট্র্যাপের এসব অভিযোগের বিষয়ে কালিহাতী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাইয়ুম খান সিদ্দিকী জানান,এ বিষয়ে কেউ থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আল/টিকে