দিনাজপুরের বীরগঞ্জে সাঁওতাল আদিবাসীদের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী মেলা এবারও বসেছে। ছবি : সময়ের আলোদিনাজপুরের বীরগঞ্জে সাঁওতাল আদিবাসীদের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী মেলা এবারও বসেছে। কোনো রকম প্রচার ছাড়াই প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরের দিন বাসিয়া হাটিতে এ মেলা বসে। একসময় এ মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে এটি বউমেলা নামে পরিচিত। তবে সময়ের বিবর্তনে এখন আর সেই প্রথা নেই, মেলাটি রূপ নিয়েছে মিলনমেলায়।
শুক্রবার গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আয়োজনে এই মেলায় সকাল থেকে প্রচলতি প্রথা অনুযায়ী সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা বাহারি সাজে বাড়ির বড়দের সঙ্গে মেলায় আসেন। ভিড় বাড়তে থাকলেও মূল মেলা শুরু হয় বেলা ৩টার পর, চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এই মেলায় হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বীরগঞ্জ থানা পুলিশের নেতেৃত্বে আনসার ও গ্রামপুলিশ সদস্যরা।
মেলার আয়োজক কমিটি আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি জোসেফ হেমরম বলেন, লোকমুখে শোনা যায়, ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে এই মেলা চলছে। তবে মেলাটি কবে শুরু হয়েছে কেউ বলতে পারে না। একসময় জীবনসঙ্গী খোঁজের বউমেলা নাম হলেও কালের বিবর্তনে আধুনিক যুগের প্রভাবে এখন আর সেই বিয়ে বা জীবনসঙ্গী খোঁজার প্রথা এখানে নেই। সাঁওতালরা শিক্ষিত হচ্ছে, তারা এখন সামাজিকভাবে চলে। দীর্ঘদিন ধরে শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরের দিনটিতে আমরা দূরদুরান্তের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে মিলনমেলায় রূপ দিয়েছি।
সরেজমিন দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন বয়সের মানুষের পাশাপাশি মেলায় বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে মেলা হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। ব্যাপক উৎসাহ- উদ্দীপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত ব্যতিক্রমধর্মী এই মেলায় বিভিন্ন বয়সি নারী-পুরুষের ভিড় ও ঠেলাঠেলি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাহারি সব কাচের চুরি, রঙিন ফিতা, লিপস্টিক, কানের দুল, ঝিনুকের মালা, মাটির তৈরি খেলনা, গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত দা, কুড়াল, হাঁড়ি, পাতিলসহ বিভিন্ন খাবারের দোকান নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে আসা দোকানিরা ব্যস্ত তাদের দোকানের মালামাল বিক্রি করা নিয়ে। পাশাপাশি চলতে থাকে বাজনার তালে তালে ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গানের আসর। সাঁওতাল তরুণীরা বাহারি ফুলের সাজে সেজে নিজেদের মেলে ধরেন রঙিন পোশাকে।
আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস বলেন, আগে কঠিন সামাজিক বিধিবিধান থাকলেও বর্তমানে অনেকেই রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি মেনে বিয়ে করছেন। রটনা থাকলেও এখন আর আগের মতো কোনো ঘটনা ঘটে না। মেলা উপলক্ষে চলে সংস্কৃতি অনুষ্ঠান ও আদিবাসীদের আনন্দ মেলা যা মিলনমেলায় রূপান্তরিত হয়েছে।
বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী নেতা শীতল মার্ডী জানান, আমাদের পূর্বপুরুষরা এই মেলা শুরু করেন। আমরা শুধু ধারাবাহিকতা রক্ষা করে যাচ্ছি। তবে কবে থেকে এ মেলার প্রচলন শুরু হয়েছে সেটা সঠিকভাবে বলা যাবে না। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, যুগ যুগ ধরে এ মেলা আপনা-আপনি চলছে। আমরা শুধু আনুষ্ঠানিকতা চালিয়ে যাচ্ছি বাপ-দাদার পথ ধরে।
সময়ের আলো/আতা