চলনবিলের দেশি মাছ ও ঐতিহ্যবাহী শুঁটকিশিল্প। ছবি : সময়ের আলো‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—এই পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সিরাজগঞ্জের চলনবিলের দেশি মাছ ও ঐতিহ্যবাহী শুঁটকিশিল্প। একসময় বিলের মাছের প্রাচুর্যে মুখর থাকত শুঁটকিমহালগুলো। বাঁশের মাচায় সারি সারি মাছ শুকানো, শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা আর শুঁটকির ঘ্রাণে প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে। কিন্তু সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই ফিকে। দেশি মাছের সংকটে কমছে শুঁটকির উৎপাদন, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক মহাল। অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ব্যবসায়ী, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ।
উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের শুঁটকির বাজারে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দেশের চাহিদার প্রায় ৫৮ শতাংশ শুঁটকি ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা হচ্ছে। অথচ চলনবিলের শুঁটকির দেশজুড়ে সুনাম রয়েছে, বিদেশেও রয়েছে চাহিদা। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মাছের সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে কঠিন সময় পার করছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প।
সিরাজগঞ্জ মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বছরে মোট মাছ উৎপাদন হয় ৭৮ হাজার ৯৪৫ দশমিক ১৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চলনবিল অধ্যুষিত উল্লাপাড়া ও তাড়াশ উপজেলায় উৎপাদিত হয় ৫ হাজার ২৩০ দশমিক ৭৩ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ দুই উপজেলার ৬০টি শুঁটকিমহালে উৎপাদিত হয়েছিল ৩০২ মেট্রিক টন শুঁটকি, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ১৮৫ দশমিক ১৭ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি মৌসুমে মাছের সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্থানীয় মাছের ওপর নির্ভরশীল এই শিল্পে কাঁচামালের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে আরও অনেক মহাল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে দেশি শুঁটকির সরবরাহও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় চলনবিলের যেসব এলাকায় সারা বছর পানি থাকত, সেসব স্থানে এখন বর্ষা ছাড়া অন্য সময় পানি থাকে না বললেই চলে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ, বসতবাড়ি এবং শিল্প-কারখানা সম্প্রসারণের কারণে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিষ প্রয়োগ করে মাছ চাষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনাও দেশি মাছের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন তারা। এতে মাছ ধরার পরিমাণ কমার পাশাপাশি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শুঁটকিমহালগুলো।
সম্প্রতি চলনবিল অধ্যুষিত উল্লাপাড়ার আড়ুয়া পাঙ্গাসী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি চাতালে নারী-পুরুষ মিলে শুঁটকি তৈরির কাজে ব্যস্ত। বাঁশের মাচায় শুকানো হচ্ছে পুঁটি, খলশে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, নলা ও টাকি মাছ। তবে গত বছরের তুলনায় মাছের সরবরাহ কম থাকায় মহালগুলোতে কর্মচাঞ্চল্যও কম।
স্থানীয় চাতালমালিক জাকারিয়া জানান, শুঁটকি উৎপাদনের এখন ভরা মৌসুম। কিন্তু চলনবিলে মাছের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে অন্য এলাকা থেকে কাঁচা মাছ কিনে এনে শুঁটকি তৈরি করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কমছে লাভের সম্ভাবনা।
তিনি বলেন, গত বছর তার চাতালে প্রায় ৩৫ টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। এবার মাছের যে অবস্থা, তাতে ১০ থেকে ১৫ টন উৎপাদন হবে কি না, তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে। আগে স্থানীয় মাছ দিয়েই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা যেত। এখন মাছ সংগ্রহ করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাকারিয়ার মতে, দেশে এখনো বড় পরিসরে আধুনিক শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে ওঠেনি। শুঁটকি সংরক্ষণেও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া গেলে এ শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি—দুটিই বাড়ানো সম্ভব।
শুঁটকিচাতালের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনেও। সেখানে কাজ করা নারী শ্রমিক শিল্পী বেগম জানান, সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা ১১ ঘণ্টা কাজ করে তিনি মজুরি পান মাত্র ২০০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু বিকল্প কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে শুঁটকিমহালে শ্রম দিতে হচ্ছে তাকে।
মাছের সংকটে মহাল বন্ধ হয়ে গেলে এসব শ্রমিকের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা সরাসরি আঘাত হানছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জীবিকায়।
তাড়াশ উপজেলার মান্নাননগর এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, চলনবিলে মাছের সংকটের কারণে প্রায় ৫০ শতাংশ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় ৬ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। তিনি বলেন, মাছ না থাকায় অনেক মহাল চালু রাখা যাচ্ছে না। যেসব মহাল চলছে, সেখানেও প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচা মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি শ্রমিকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নিয়মিত কাজ না থাকায় অনেক পরিবার সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, চলনবিলের শোল, বোয়াল, পুঁটি, খলশে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি ও বাইমসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দিয়ে শুঁটকি তৈরি হয়। কিন্তু মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় আগের মতো উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না।
চলনবিলের শুঁটকির বাজার শুধু দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, এ অঞ্চলে উৎপাদিত উন্নত মানের শুঁটকি যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১০ থেকে ১২টি দেশে রপ্তানি হয়। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শুঁটকির প্রায় ২০ শতাংশ বিদেশের বাজারে যায়।
ব্যবসায়ীরা জানান, মানের ভিত্তিতে শুঁটকিকে এ, বি ও সি—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। উন্নত মানের এ গ্রেডের শুঁটকি মূলত রপ্তানি করা হয়। বি ও সি গ্রেডের শুঁটকি বিক্রি হয় ঢাকা, সৈয়দপুর, তিস্তা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঢাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে চলনবিলের শুঁটকি বিদেশের বাজারে পৌঁছায়।
তবে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারের চাহিদা পূরণে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে শুঁটকি আমদানি করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের দাবি, প্রতি মাসে এসব দেশ থেকে দেড় থেকে দুই হাজার টন শুঁটকি আমদানি করা হয়। আমদানি করা শুঁটকির কিছু অংশের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দেশি শুঁটকির স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মানের কারণে ক্রেতাদের কাছে এর আলাদা কদর রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত উৎপাদন না থাকায় বাজারের বড় একটি অংশ বিদেশি শুঁটকির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাছের প্রজাতি, আকার ও মানভেদে শুঁটকির দাম নির্ধারিত হয়। বর্তমানে ছোট আকারের মাছের শুঁটকি প্রতি মণ ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং বড় আকারের মাছের শুঁটকি প্রতি মণ ২২ হাজার থেকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
দাম বেশি হলেও কাঁচা মাছের সংকট, সংগ্রহ ও পরিবহন ব্যয় এবং উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত লাভ করতে পারছেন না। পর্যাপ্ত মাছ না পেয়ে অনেক জেলে মাছ ধরতেও আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে মাছ সংগ্রহ থেকে শুরু করে শুঁটকি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ—পুরো ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম বলেন, একসময় তার মহালে শুঁটকি তৈরির জায়গার সংকুলান হতো না। অথচ এবার মাছের অভাবে মহালজুড়ে নীরবতা। অনেক জেলে মাছ না পেয়ে চলনবিলে মাছ ধরতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, প্রতিবছর এ খাত থেকে সরকার রাজস্ব পেলেও শিল্পটির উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। এখনো প্রচলিত পদ্ধতিতেই শুঁটকি তৈরি হচ্ছে। অথচ আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়ানো সম্ভব।
ব্যবসায়ীদের মতে, শুঁটকিশিল্পের টেকসই উন্নয়নে প্রথমেই চলনবিলের দেশি মাছের প্রজননক্ষেত্র ও আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি উন্নত শুকানোর প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার এবং সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশি শুঁটকির প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বাড়বে।
উল্লাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, দেশি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অবৈধ কারেন্ট ও দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধ, মাছের পোনা রক্ষা এবং প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, চলনবিলের শুঁটকির সুনাম ও চাহিদা দুটোই রয়েছে। দেশি মাছ সংরক্ষণ এবং শুঁটকির গুণগত মান উন্নয়নে চাতালমালিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
চলনবিলের শুঁটকিশিল্প একদিকে বাংলার ঐতিহ্যের অংশ, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনাময় খাত। কিন্তু মাছের প্রাকৃতিক উৎস সংকুচিত হওয়া, উৎপাদন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক সংরক্ষণ অবকাঠামোর অভাব শিল্পটিকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলছে।
মৎস্যসম্পদ রক্ষা, জলাশয় ও প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শ্রমিকদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তা না হলে একসময় দেশি মাছের প্রাচুর্য ও শুঁটকির সুবাসে পরিচিত চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী শিল্প আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে, বাড়বে বিদেশি শুঁটকির ওপর নির্ভরতা।
সময়ের আলো/জোই