দখল-ভরাটে অস্তিত্ব হারাচ্ছে ময়নাকাটা নদী

মেহেরাব হোসেন, শিবচর (মাদারীপুর)

সারাদেশ

একসময় ঢাকা থেকে পণ্য আসত মাদারীপুরের শিবচর বাজারে, ট্রলারে করে নদীপথে শিবচর থেকে মাদারীপুরে যাতায়াত করতেন মানুষ। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও

2026-10-25T13:00:28+00:00
2026-10-25T13:00:28+00:00
 
  রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬,
৯ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
দখল-ভরাটে অস্তিত্ব হারাচ্ছে ময়নাকাটা নদী
মেহেরাব হোসেন, শিবচর (মাদারীপুর)
প্রকাশ: রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০০ পিএম 
অস্তিত্ব সংকটে ময়নাকাটা নদী। ছবি : সময়ের আলো
একসময় ঢাকা থেকে পণ্য আসত মাদারীপুরের শিবচর বাজারে, ট্রলারে করে নদীপথে শিবচর থেকে মাদারীপুরে যাতায়াত করতেন মানুষ। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল ময়নাকাটা নদী। কিন্তু দখল, ভরাট ও নাব্যতা সংকটে সেই নদীই এখন অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। কোথাও নদীর স্বাভাবিক প্রশস্ততা কমে গেছে, কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে পানিপ্রবাহ। ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচলও। একসময়ের ব্যস্ত নৌপথ এখন অনেকটাই মৃতপ্রায়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর বিভিন্ন অংশে মাটি ফেলে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। পাঁচ্চর বাজারের আশপাশে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় নদীর তলদেশে পলি ও বালু জমে নাব্যতা কমেছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ।

ময়নাকাটা নদীর উৎপত্তি আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে। শিবচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে পাঁচ্চর ও মাদবরেরচর হয়ে নদীটি পদ্মার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। তবে বর্তমানে আড়িয়াল খাঁ ও পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থলের একাধিক অংশ ভরাট হয়ে গেছে। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশেও নদীর প্রবাহ সরু হয়ে পড়েছে। ওই অংশে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থলের কিছু অংশে মাটি ফেলে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে।

পাঁচ্চর এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, একসময় বর্ষায় পদ্মা থেকে প্রচুর পানি ময়নাকাটা নদীতে প্রবেশ করত। নদীপথে সহজেই পণ্য পরিবহন করা যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহ কমে গেছে। নদীর বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও ঘরবাড়ি। কোনো কোনো স্থানে নদী এতটাই সরু হয়ে গেছে যে সেটিকে আর নদী বলে চেনা কঠিন।

মাদবরেরচর এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, ‘ময়নাকাটা নদীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থল। ওই সংযোগ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে মাটি ভরাট করে বাড়িঘর ও দোকানপাট নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ফলে পদ্মা থেকে ময়নাকাটা নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এখন আর নেই।’

চর টেকেরহাট এলাকার বাসিন্দা মো. খালেক বলেন, ‘আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ময়নাকাটা নদীর সরাসরি সংযোগ ছিল। এখন সংযোগস্থল বালু জমে পুরোপুরি ভরাট হয়ে আছে। আট-দশ বছর আগে খনন শুরু হয়েছিল। কিছুদিন কাজ চলার পর আর দেখা যায়নি। খননের কাজও পুরোপুরি হয়নি। দিন দিন নদীটি আরও ভরাট হয়ে যাচ্ছে।’


নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৭ সালে খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই বছরের ৩ জুন তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান শিবচর উপজেলার চর টেকেরহাট থেকে শিবচর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার নৌপথের খননকাজ উদ্বোধন করেন। ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পে আট লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করে নৌপথটি সচল করার পরিকল্পনা ছিল।

তবে প্রকল্পের আওতায় শেষ পর্যন্ত কতটুকু খনন করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কিছুদিন কাজ চলার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে খননকাজ শুরুর স্থানগুলোর কিছু অংশও আবার ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নেওয়া উদ্যোগের সুফল কতটা পাওয়া গেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

একসময় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম ভরসা ময়নাকাটা নদীর এমন অবস্থায় উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী। তাদের মতে, নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হলে আশপাশের কৃষিজমি ও জলজ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবও কমতে পারে।

এ জন্য নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল ও ভরাট বন্ধ, প্রয়োজনীয় খনন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে নদীটির অবশিষ্ট অংশও হারিয়ে যেতে পারে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, বিআরএস নকশা ও পর্চা অনুযায়ী নদীটির সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলার প্রতিটি নদী ও খালের প্রকৃত চিত্র বের করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ সাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সাদত মো. হাসান কবির বলেন, শিবচর উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা নদী ময়নাকাটা নদীর অনেক স্থানেই দখল ও নাব্যতা সংকটে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার পথে। তবে এই মুহূর্তে ময়নাকাটা নদী খনন ও পুনরুদ্ধারের কোনো কার্যক্রম আমাদের হাতে নেই। ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ময়নাকাটা নদী উদ্ধার ও খননের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

স্থানীয়দের কাছে ময়নাকাটা শুধু একটি নদী নয়, এটি একসময়কার যোগাযোগ ও বাণিজ্যের স্মৃতিও। দখল-ভরাটের কারণে সেই নদীপথ হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সংকুচিত হচ্ছে স্থানীয় নৌযোগাযোগের সম্ভাবনা। তাই নদীটির সীমানা চিহ্নিত করে দখলমুক্ত করা, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   মিাদারীপুর  শিবচর  দখল  ভরাট  অস্তিত্ব সংকট  ময়নাকাটা নদী  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: