প্রকাশ: রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
বংশীবাদক জগদীশ চন্দ্র শীল। ছবি : সময়ের আলোআধুনিক প্রযুক্তি আর যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে বাঁশির সুর। তবু ভোলার চরফ্যাশনের পথে পথে এখনো শোনা যায় সেই চিরচেনা সুরের মূর্ছনা। এর পেছনে রয়েছেন ৭০ বছর বয়সী বংশীবাদক জগদীশ চন্দ্র শীল। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও কাঁধে বাঁশির ঝুলি নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ান তিনি। বাঁশি তৈরি ও বিক্রির পাশাপাশি সুরের মাধ্যমে ধরে রেখেছেন বাংলার লোকজ ঐতিহ্য।
সম্প্রতি চরফ্যাশন উপজেলা সদরে দেখা মেলে এই প্রবীণ বাঁশি শিল্পীর। তার বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে থমকে দাঁড়ান স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা বয়সী পথচারী। কেউ শখ করে কিনে নেন বাঁশি, আবার কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন তার পরিবেশনা।
জগদীশ চন্দ্র শীলের বাড়ি বরগুনার বেতাগী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডে। অভাবের কারণে শৈশবে পড়াশোনার সুযোগ হয়নি তার। জীবিকার সন্ধানে একসময় যাত্রাদলে বংশীবাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রায় সাত বছর সেই দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর দলটি ভেঙে গেলে কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি। তবে জীবিকার লড়াইয়ে থেমে যাননি।
স্ত্রী রমলা রাণী, ছেলে জয়ন্ত ও পুত্রবধূ বন্নিকাকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন পারিবারিক কুটিরশিল্প। সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম থেকে মুলি বাঁশ সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের বাঁশি। এরপর সেগুলো নিয়ে ছুটে যান দেশের বিভিন্ন হাটবাজার, স্কুল-কলেজ ও গ্রাম্য মেলায়।
এভাবেই কেটে গেছে তার জীবনের প্রায় ৪৮ বছর। বর্তমানে ৫০ থেকে ৫০০ টাকা দামের বাঁশি বিক্রি করে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করেন জগদীশ চন্দ্র। এই আয় দিয়েই চলে তার চার সদস্যের সংসার।
তবে দীর্ঘদিনের এই লোকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। জগদীশ চন্দ্রের মতে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাঁশির প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। দীর্ঘদিন কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকেও সরকারি কোনো সহায়তা পাননি বলে আক্ষেপ তাঁর।
জগদীশ চন্দ্র বলেন, এত বছর ধরে কুটিরশিল্পের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তিনি কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। অথচ এই কাজের সঙ্গে যুক্ত নন, এমন অনেকেও বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন বলে তার অভিযোগ।
স্থানীয়দের মতে, প্রযুক্তির বিস্তারে গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ যখন হারিয়ে যাচ্ছে, তখন জগদীশ চন্দ্র শীলের মতো শিল্পীরা নিজেদের শ্রম ও সাধনায় সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের হাত ধরেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যাচ্ছে বাঁশির সুর। এই লোকজ ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন শিল্পীদের প্রতি যথাযথ সহযোগিতা ও নতুন প্রজন্মের আগ্রহ তৈরি করা।
সময়ের আলো/জোই