ছবি : সংগৃহীতনাটোরের গুরুদাসপুরে ‘কালো জাদু’ করার অভিযোগে একই পরিবারের তিন নারীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন, গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করা এবং জোর করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। চলতি মাসের ৫ তারিখে পৌরসভার গাড়িষাপাড়া মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে।
সামাজিক লোকলজ্জা, অব্যাহত হুমকি এবং চরম আতঙ্কের কারণে ভুক্তভোগী পরিবারটি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। নির্যাতনের শিকার এই তিন নারী হলেন— প্রবাসী পিন্টু আলীর স্ত্রী, তার মেয়ে এবং তার শাশুড়ি।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় যুবদলকর্মী জিয়ারুল, তার ভাই ইয়ারুল সরদার এবং তাদের বেশ কয়েকজন স্বজনের দিকে। ইতোমধ্যে এই নির্যাতনের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্ত ইয়ারুল সরদারের জামাতা রাতুলের সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের এক তরুণীর বিয়ের কথা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ইয়ারুলের নিজের মেয়ে ঐশীর সঙ্গেই রাতুলের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর ঐশী অসুস্থ হয়ে পড়লে ইয়ারুলের পরিবার সন্দেহ প্রকাশ করে যে, বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ক্ষোভে ভুক্তভোগী নারীর মেয়ে ‘কালো জাদু’ করে ঐশীকে অসুস্থ করে ফেলেছেন। কোনো এক তান্ত্রিকের মাধ্যমে নাকি তারা এই তথ্য জানতে পেরেছেন। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মাসখানেক আগে থানায় একটি অভিযোগও দায়ের করেছিলেন ইয়ারুল সরদার।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী গৃহবধূর দাবি, জিয়ারুলের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়া এবং তাদের নতুন বাড়ি নির্মাণের সময় মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে তা না পাওয়ার কারণে তাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি বিষয়টি তার স্বামীকে জানানোর পর স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে তা মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়েই জিয়ারুল ও তার সহযোগীরা এই পরিকল্পিত ঘটনা ঘটিয়েছে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৫ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে যুবদলকর্মী জিয়ারুলের নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি দল হামলা চালায় পিন্টু আলীর বাড়িতে। প্রথমে তারা পিন্টুর বৃদ্ধ শ্বশুর সালামত আলীকে মারধর করে। এরপর ওই তিন নারীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর তাদের আরও শাস্তি দিতে বাড়ি থেকে বের করে গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্য সড়কে ঘোরানো হয়। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের ‘অপরাধ’ আর করবে না— এমন মুচলেকা আদায় করতে তাদের দিয়ে জোরপূর্বক ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরও নেওয়া হয়।
তবে এই ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন ইয়ারুল সরদার। তার দাবি, রাতুল অন্যত্র বিয়ে করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওই পরিবার তার মেয়ে ঐশির ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে কালো জাদু করেছে বলে তাদের সন্দেহ হয়। ঐশীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে সুস্থ করে তুলতে তারা কেবল একজন কবিরাজ ডেকেছিলেন মাত্র।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সালামত প্রামাণিক জানান, ঘটনার দিন সকালে ১৫-২০ জন লোক হাতে লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে পিন্টু আলীর বাড়িতে চড়াও হয়। তিনি তাদের পরিচয় ও আসার কারণ জানতে চাইলে তারা তার সঙ্গে চরম মারমুখী আচরণ করেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার হাফেজ মাওলানা বাইজিদ হোসেন বলেন, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে যথাযথ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠামাত্রই তাকে অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করা যায় না; আবার সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করে কাউকে নির্যাতন বা অপমান করার অধিকারও কারও নেই। বিচার হতে হবে দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে, কোনোভাবেই জনতার হাতে নয়।
গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন তিনি কর্মস্থলের বাইরে ছিলেন। পরে থানায় ফিরে তিনি জানতে পারেন যে, ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ ৬ অক্টোবর ভুক্তভোগী গৃহবধূর পক্ষ থেকে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। নিয়ম মেনেই সেই জিডি নাটোর আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নানও জিডি নথিভুক্ত করে তা আদালতে প্রেরণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ এই ঘটনায় মন্তব্য করে বলেন, গাড়িষাপাড়ায় তিন নারীকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। যেহেতু এটি একটি স্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ, তাই এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মূল দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
সময়ের আলো/আতা