বিশ্বজুড়ে ভাবমূর্তি তলানিতে, ইসরায়েলের নির্বাচনে ইস্যুটি গুরুত্ব পাচ্ছে না কেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গত কয়েক মাসে ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলি পর্যটকদের হয়রানি ও হামলার শিকার হওয়ার খবর প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি

2026-10-27T06:13:31+00:00
2026-10-27T06:13:31+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বিশ্বজুড়ে ভাবমূর্তি তলানিতে, ইসরায়েলের নির্বাচনে ইস্যুটি গুরুত্ব পাচ্ছে না কেন?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৩ এএম 
০২৬ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা নিউইয়র্কের মিডটাউন ম্যানহাটনে অবস্থিত জাতিসংঘের দিকে পদযাত্রা করছেন। ছবি : সংগৃহীত

গত কয়েক মাসে ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলি পর্যটকদের হয়রানি ও হামলার শিকার হওয়ার খবর প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীদের ইসরায়েলি পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পর তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জুলাইয়ে মন্টেনেগ্রোতে বেড়াতে যাওয়া একদল ইসরায়েলি পর্যটকের মুখোমুখি হন স্থানীয় বলে ধারণা করা এক নারী ও পুরুষ। তারা পর্যটকদের উদ্দেশে বলেন, ‘গণহত্যা থেকে একটু বিরতি নিতে এসেছেন?’ এরপর তাদের ইসরায়েলে ফিরে যেতে বলেন। গ্রিসে এক ইসরায়েলি নারী অভিযোগ করেন, নিজের পরিচয় জানানোর পর একটি রেস্তোরাঁ তাকে খাবার পরিবেশন করতে অস্বীকৃতি জানায়।

থাইল্যান্ডে এক মা ও মেয়েকে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই মায়ের ভাষ্য, তারা ইসরায়েলি পরিচয় জানানোর পর এক ব্যক্তি তাদের ওপর হামলা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি হোটেলে ওঠার সময় এক ইসরায়েলি দম্পতিকে ‘শিশু হত্যাকারী’ বলে কটাক্ষ করা হয়।

এসব ঘটনা এমন সময়ে সামনে আসছে, যখন বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ঐতিহাসিকভাবে তলানিতে নেমেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ৩৬টি দেশে পরিচালিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশগুলোর প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মধ্যম হিসাবে ৬৭ শতাংশের ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসরায়েলের প্রতি বিরূপ মনোভাব বাড়ছে। গাজায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানকে ক্রমেই বেশিসংখ্যক বিশ্বনেতা ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং সেখানে ইসরায়েলি সরকারের নীতির কারণে কয়েকটি দেশ, এমনকি ইসরায়েলের কিছু মিত্রও, সম্পর্ক শিথিল করেছে বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

তবে এসব পরিস্থিতির মধ্যেও আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনে দেশটির কূটনীতি, বিশ্বজুড়ে ভাবমূর্তি এবং তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দায় কার, তা নিয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না।

ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ, কিন্তু সমাধান নিয়ে সংশয়

জিউইশ পিপল পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়াকভ কাটজ জিউইশ টেলিগ্রাফিক এজেন্সিকে বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের নীতি ও কর্মকাণ্ড ব্যাখ্যা করতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সরকার যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। তারপরও অধিকাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, পরিস্থিতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

কাটজের ভাষ্য, নেতানিয়াহু প্রায়ই বলেন, ইসরায়েল যা-ই করুক না কেন, পুরো বিশ্ব তাদের বিরুদ্ধে এবং তারা যা-ই বলুক, সেটিকে ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে দেখা হয়। অনেক ইসরায়েলি এই যুক্তি মেনে নেন এবং তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না।

কাটজ বলেন, অনেক ইসরায়েলি মনে করেন, বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষের যে উত্থান ঘটেছে, ইসরায়েল যা-ই করুক না কেন, তা অব্যাহত থাকবে। তাদের ধারণা, গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজারের বদলে ১০ হাজার হলেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠতই।

তার মতে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশটির অস্তিত্বের জন্য গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে, বিষয়টি অনেক ইসরায়েলি পুরোপুরি উপলব্ধি করেন না। বরং তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থনের মতো খবর থেকে স্বস্তি খোঁজেন।

ভোটারদের প্রধান চিন্তা নিরাপত্তা

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো অফির দায়ান বলেন, বিদেশে ইসরায়েলকে ঘিরে কী ঘটছে, সে বিষয়ে ইসরায়েলিরা সচেতন এবং উদ্বিগ্ন। তবে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধের মধ্যে থাকা দেশটির ভোটারদের সামনে আরও জরুরি কিছু বিষয় রয়েছে।

দায়ানের মতে, নেতানিয়াহু সরকার কী করেছে বা করেনি, তা নিয়ে আলোচনার সময় আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির বিষয়টিও উঠে আসে। কিন্তু অধিকাংশ ভোটার শুধু এই ইস্যুতে কোনো দল বা প্রার্থীকে ভোট দেবেন, এমন সম্ভাবনা কম। কারণ, এটি তাদের কাছে অগ্রাধিকার নয়।

তিনি বলেন, ইসরায়েলি ভোটাররা সাধারণত একটি প্রধান ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দেন। এবারের নির্বাচনে সেই ইস্যু নিরাপত্তা। ৭ অক্টোবরের হামলার পর খুব বেশি সময় পেরোয়নি, তাই ভোটারদের অবস্থান বদলে শুধু আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক আন্তর্জাতিক মুখপাত্র পিটার লারনারও মনে করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থানের চেয়ে নির্বাচনে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন কি না এবং বাম ও ডানপন্থীদের মধ্যে কারা এগিয়ে থাকবে, সেই প্রশ্ন।

লারনার বলেন, এসব প্রশ্নের সঙ্গে ৭ অক্টোবরের ঘটনা এবং দেশের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় কে বেশি উপযুক্ত, সেই বিষয়গুলোও জড়িত। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে খুব কম রাজনীতিক কথা বলছেন। কেউ বললেও তা অন্য ইস্যুর তুলনায় গৌণ হয়ে থাকছে।

নির্বাচনি প্রচারে সেই প্রত্যাশা দিচ্ছেন কারা?  

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে আসন পেতে পারে এমন প্রায় এক ডজন দলের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি দল দেশটির নেতিবাচক আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে কথা বলেছে বা জনকূটনীতি উন্নত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন বিয়াচাদ পার্টি ইসরায়েল ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ইহুদিদের সম্পর্ক পুনর্গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে। দলটি নেসেটে এমন একজন পর্যবেক্ষক রাখার প্রস্তাব দিয়েছে, যিনি ভোটাধিকার ছাড়াই প্রবাসী ইহুদিদের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবেন।

সাবেক ইসরায়েলি সেনা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওফের উইন্টারের নেতৃত্বাধীন নতুন ডানপন্থী দল পিপল অব ইসরায়েলের প্রার্থী তালিকায় জনকূটনীতি নিয়ে কাজ করা দুই পরিচিত ব্যক্তিও রয়েছেন। তারা হলেন ইউসেফ হাদ্দাদ ও ফ্লুর হাসান-নাহুম। হাদ্দাদ একাধিকবার বলেছেন, তিনি ইসরায়েলের পরবর্তী জনকূটনীতি-বিষয়ক মন্ত্রী হতে চান।

ইসরায়েল সরকারের সাবেক মুখপাত্র ও সাংবাদিক আইলন লেভি জিউইশ টেলিগ্রাফিক এজেন্সির ‘ওয়েটিং ফর ৬১’ পডকাস্টে বলেন, ইসরায়েলিরা জনকূটনীতিকে ‘হাসবারা’ নামে অভিহিত করেন। তবে অধিকাংশ প্রার্থীর কাছে এটি নিজেই কোনো লক্ষ্য নয়। বরং জাতীয় স্বার্থ অর্জনে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করা যায়, সেটিই তাদের আলোচনার মূল বিষয়।


লেভির মতে, এ ক্ষেত্রে দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী ওতজমা ইয়েহুদিত পার্টির অবস্থান হলো, ইসরায়েলকে কঠোর হিসেবে তুলে ধরতে হবে। উদারপন্থীরা এতে অসন্তুষ্ট হলে তাদের আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

লেভি বলেন, বামপন্থীদের অবস্থানও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। তাদের একটি অংশ মনে করে, ইসরায়েল যদি স্বাভাবিক দেশের মতো আচরণ করে এবং মন্ত্রীরা আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া বন্ধ করেন, তাহলে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার মতে, ইসরায়েল সম্পর্কে বিশ্বজনমত কতটা বদলে গেছে এবং নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশায় কতটা পরিবর্তন এসেছে, তা তারা হয়তো যথাযথভাবে উপলব্ধি করছেন না।

লেভি মনে করেন, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নতুন সরকার গঠিত হলেও ইসরায়েল সম্পর্কে বিশ্বজনমতে রাতারাতি বড় পরিবর্তন আসবে না। তবে তুলনামূলক মধ্যপন্থী সরকার অন্তত ইসরায়েলের প্রতি কম বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর কাছ থেকে কিছুটা সদিচ্ছা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায় এলেই ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থান জাদুর মতো বদলে যাবে, এমনটা তিনি মনে করেন না। তবে তুলনামূলক মধ্যপন্থী সরকার সেই দেশগুলোর কাছ থেকে কিছুটা সমর্থন পেতে পারে, যারা নীতিগতভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন করে। 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   ভাবমূর্তি  ইসরায়েল  নির্বাচন 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: