গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলা সংক্রমণ। সংগৃহীত ছবি গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলা সংক্রমণ ঠেকাতে কাজ করার সময় হামলার শিকার হয়েছেন দুই স্বাস্থ্যকর্মী। এ ঘটনায় একজন নার্স নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরেক স্বাস্থ্যকর্মী। এদিকে ইবোলার বিস্তার রোধে প্রতিবেশী দেশ কঙ্গোর সঙ্গে যাতায়াতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে উগান্ডা।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় কয়েকজন তরুণ স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা চালান। তাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্যকর্মীরা পানির উৎস দূষিত করছেন এবং ইবোলা ছড়াচ্ছেন।
জাতিসংঘের সহায়তায় পরিচালিত রেডিও ওকাপিও এ তথ্য জানিয়েছে।
হামলার নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। নিহত নার্সের পরিবার ও সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আহত স্বাস্থ্যকর্মীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে সংস্থাটি।
কঙ্গো থেকে যাতায়াতে উগান্ডার বিধিনিষেধ
ইবোলার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কঙ্গোর সঙ্গে সীমান্ত পারাপারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে উগান্ডা। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কঙ্গো থেকে উগান্ডায় ফিরে আসা নাগরিকদের ২১ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ও বহন করতে হবে তাদের নিজেদের।
উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কঙ্গো থেকে কেবল জরুরি প্রয়োজনে আসা ব্যক্তিদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। এ তালিকায় ত্রাণকর্মী, ট্রাকচালক ও নিরাপত্তাকর্মীরা রয়েছেন। তবে সীমান্ত অতিক্রমের আগে তাদের কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এ ছাড়া বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে উগান্ডায় প্রবেশকারী যাত্রীদের অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য দিয়ে একটি ফরম পূরণ করতে হবে। সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা অন্যদের শনাক্ত করতে এসব তথ্য ব্যবহার করা হবে।
ইবোলা নিয়ে গুজবে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা
কঙ্গোতে ইবোলা মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত মাসে ইবোলা প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপের পক্ষে প্রচার চালানোর পর এক রাজনীতিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত আগস্টে রেড ক্রস জানায়, ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর প্রথম ১০০ দিনে তাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা ১১টি সহিংস ঘটনার মুখে পড়েন। এসব ঘটনায় কয়েকজন আহত হন। এ ছাড়া একটি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইবোলা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা হামলার শিকার হচ্ছেন। এমনকি কেউ কেউ ইবোলা নামে কোনো রোগের অস্তিত্ব নেই বলেও দাবি করছেন।
কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় সংক্রমণ শনাক্ত
চলতি মাসের শুরুতে কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় ইবোলার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। দেশ দুটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত সংক্রমণ সেখানে প্রথমবারের মতো শনাক্ত করা হয়েছে।
সোমবার নাইজেরিয়ায় আক্রান্ত এক নারীকে রাজধানী আবুজা থেকে সুইজারল্যান্ডে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে আরও চিকিৎসা দেওয়া হবে। আফ্রিকা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের প্রধান জ্যঁ কাসেয়া জানান, ওই নারীর জন্ম উগান্ডায়। তিনি সুইজারল্যান্ডের এক কূটনীতিকের স্ত্রী। ছুটি কাটাতে তিনি উগান্ডার রাজধানীতে গিয়েছিলেন।
ওই নারীর শরীরে ইবোলার কোনো উপসর্গ না থাকলেও তাকে স্বামীর সঙ্গে সুইজারল্যান্ডে নেওয়া হয়েছে। নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি সচেতন আছেন এবং কথা বলতে পারছেন। তিনি কোথায় সংক্রমিত হয়েছেন, তা খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর উগান্ডার পক্ষ থেকে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। আক্রান্ত নারী এবং কেনিয়ার এক ব্যবসায়ী উগান্ডার মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করেছিলেন। ওই ব্যবসায়ী কঙ্গো থেকে কেনিয়ায় এসেছিলেন এবং সেখানে তার ব্যবসা ছিল।
উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কেনিয়ার ওই ব্যবসায়ীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬০ জনকে পর্যবেক্ষণ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
কেনিয়ায় আক্রান্তদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে
কেনিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, দেশটিতে প্রথম শনাক্ত হওয়া আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ২০ জন ২১ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষে বাড়ি ফিরেছেন। তবে আরও ৯৮ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। দেশটিতে ইবোলা শনাক্ত হওয়া সাতজনের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
কেনিয়ার ওই ব্যবসায়ী নাইরোবিতে পৌঁছানোর দুই দিন পর মারা যান। তার সঙ্গে সম্পর্কিত আরেক নারীও মারা গেছেন। দেশটিতে ইবোলায় আক্রান্তের সংখ্যা নয়জনে পৌঁছানোর পর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি দেশ ঘুরে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কীভাবে শনাক্ত না হয়ে ভ্রমণ করতে পারলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
উগান্ডার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্রিস বারিওমুন্সি বিবিসির ‘নিউজডে’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশকে ইবোলামুক্ত রাখতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চলতি মাসে কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর উগান্ডা বারবার জানিয়েছে, দেশটিতে নতুন করে কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।
তবে কঙ্গোতে ইবোলার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর উগান্ডায় ২০ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন মারা যান। পরে গত আগস্টে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উগান্ডাকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় আক্রান্ত দুই ব্যক্তি একই দিনে উগান্ডার এনটেবে বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছিলেন। তবে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব ডায়ানা আতওয়াইন জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এর আগে উগান্ডার কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, নাইজেরিয়ায় আক্রান্ত নারী দেশটির মধ্য দিয়ে কেবল যাতায়াত করেছিলেন। তার গন্তব্য ছিল কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল। তবে রোববার উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ওই নারীর চলাচল, সম্পূর্ণ ভ্রমণপথ এবং কোথায় তিনি ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন, তা নির্ধারণে উগান্ডা ও নাইজেরিয়া যৌথভাবে কাজ করছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বারিওমুন্সি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, ইবোলার ঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কঙ্গোর সঙ্গে উগান্ডার সীমান্ত রয়েছে এবং দেশটিতে এখনো ইবোলার সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যাতায়াত ও পারিবারিক যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
বান্দিবুগিও ধরনের ইবোলায় টিকা নেই
ইবোলা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরলের সংস্পর্শে এলে একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়াতে পারে। রক্ত ও বমির মতো শারীরিক তরলের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ভাইরাসের ধরনটি হলো বান্দিবুগিও। এটি ইবোলার তুলনামূলকভাবে বিরল একটি ধরন। এ ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে এ নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ