সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ছবি : গালফ নিউজ বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। তাদের এই সামরিক কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে ইরানের সহায়তা, তেল বাণিজ্য, কর-শুল্ক আদায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত ফি আরোপ এবং অর্থ স্থানান্তরের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
গবেষণা সংস্থা মোখা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের নিয়ন্ত্রিত সমান্তরাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের আর্থিক সম্পদ ও ব্যয় জড়িত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, অবৈধ তেল বাণিজ্য থেকে হুতিরা বছরে ২০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে। তবে এই দুই হিসাবের ক্ষেত্র আলাদা। তাই এগুলো যোগ করে হুতিদের মোট আয় নির্ধারণ করা যাবে না।
গত ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে হুতিদের অর্থের উৎস এবং যুদ্ধ পরিচালনার আর্থিক কাঠামোর বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ইরানের তেল ও সামরিক সহায়তা
হুতিদের অন্যতম প্রধান বিদেশি সমর্থক ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অস্ত্র, সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও তেল সরবরাহের মাধ্যমে তেহরান হুতিদের সহায়তা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দাবি, ইরান-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে হুতিদের নিয়মিত বিনা মূল্যে তেলের চালান দেওয়া হয়। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বাজারে এসব তেল বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে গোষ্ঠীটি।
এ ছাড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ কেনা এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ইরানের সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। তবে নিজেদের কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য ইরানি জ্বালানি ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা।
কর-শুল্ক ও বিভিন্ন ফি থেকে আয়
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কর ও রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলে হুতিরা। নিয়মিত করের পাশাপাশি যুদ্ধের তহবিলে অবদান রাখার নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
মোখা সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, হুতিদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন খাতে আনুমানিক অর্থের পরিমাণ হলো—
কর ও শুল্ক : ৮০ কোটি ডলার।
অতিরিক্ত ফি ও অন্যান্য আদায় : ৬০ কোটি ডলার।
নগদ অর্থ ও পণ্যের মাধ্যমে যুদ্ধের তহবিলে অবদান : ৩০ কোটি ডলার।
জনবল সংগ্রহ ও সংগঠিত করার কার্যক্রম : ১০ কোটি ডলার।
পরিবহন, সেবা ও অন্যান্য চার্জের মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর পরোক্ষ ব্যয় : ৭০ কোটি ডলার।
এসব পরিসংখ্যান হুতিদের নিরীক্ষিত সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। বরং তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থের একটি আনুমানিক চিত্র।
ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে অর্থের জোগান
নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে হুতিরা। আলজাজিরার উদ্ধৃত এক গবেষণা অনুযায়ী, গোষ্ঠীটির কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ২২৫টি প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছিল। এর ফলে হুতিদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
হুতি কর্তৃপক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিবন্ধন নবায়ন না করায় তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক গবেষক হুসাম আল-সাঈদির মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম হুতিদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের দিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তেল বাণিজ্য ও অর্থ স্থানান্তরের নেটওয়ার্ক
হুতিদের অর্থায়নে তেল ব্যবসায়ী, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান এবং ইয়েমেনের ভেতরে ও বাইরে পরিচালিত বিভিন্ন কোম্পানির ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলো তেল কেনাবেচা ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের অর্থ পরিশোধে আর্থিক মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সানা-ভিত্তিক আল রিদওয়ান এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড ট্রান্সফার কোম্পানির বিরুদ্ধে হুতি নেতাদের ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ, উন্নত অস্ত্রব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কেনার অর্থ পরিশোধে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রচলিত ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক মাধ্যমে লেনদেন সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে বিকল্প আর্থিক নেটওয়ার্কগুলো হুতিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং হুদায়দা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকি আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
উপকূলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব সুবিধাকে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থে রূপান্তর করা কঠিন। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এলাকা দখল করলেই হুতিদের আয় বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
অর্থনৈতিক চাপে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ
হুতিদের অর্থ সংগ্রহের এই ব্যবস্থার প্রভাব পড়ছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপরও। জাতিসংঘের মার্চের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির ২ কোটি ২৩ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন।
হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বহু সরকারি কর্মচারী বছরের পর বছর নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। এর মধ্যে কর, অতিরিক্ত ফি এবং যুদ্ধের তহবিলে অর্থ দেওয়ার চাপ পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট আরও বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
তবে ইয়েমেনের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তর এডেনে স্থানান্তর এবং তেল-গ্যাসের রাজস্বের ওপর বিধিনিষেধকে দায়ী করে আসছে হুতিরা।
সৌদি আরবে হামলার অর্থ আসে যেভাবে
ইরানের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত রাজস্ব, তেল বাণিজ্য এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক হুতিদের সামরিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সহায়তা করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলা এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হুমকির ঘটনায় এসব অর্থায়ন নেটওয়ার্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের সামরিক সক্ষমতা কমাতে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সরবরাহ বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। অস্ত্র কেনা, অর্থ স্থানান্তর এবং যুদ্ধের ব্যয় বহনের পেছনে থাকা আর্থিক নেটওয়ার্কগুলো কীভাবে কাজ করছে, তা শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ