ছবি : এআই জেনারেটেড দেড় যুগ আগে রেস্টুরেন্টে কাজের মাধ্যমে জাপানযাত্রা শুরু করেন কুমিল্লার মাইনুল ইসলাম। এখন রাজধানী টোকিওর বিখ্যাত এলাকা শিন-কোইওয়ায় গাড়ির ব্যবসা করেন তিনি। জাপানযাত্রার গোড়ার দিকে ভাষা নিয়ে বেশ বিড়ম্বনায় পড়েন। তবে ধীরে ধীরে জাপানিজ রপ্ত করেন মাইনুল। তবে এই চিত্রটা খুব কম। শুধু ভাষা না জানা কিংবা কম জানার কারণে বাংলাদেশি প্রবাসীরা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন। কাজ জানলেও ভাষা রপ্ত না থাকায় ভালো কাজ পান না তারা। নিম্নপর্যায়ের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয় বাংলাদেশিদের। অন্য দেশের প্রবাসীরা সেই তুলনায় বেশ এগিয়ে।
বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপান। শ্রমবাজারের জন্য বেশ প্রসিদ্ধ হিসেবে ধরা হয় সূর্যোদয়ের এই দেশকে। কিন্তু দক্ষতা, জাপানি ভাষাজ্ঞান ও চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতিতে প্রবাসীরা পিছিয়ে পড়ছেন। ভাষাগত অদক্ষতা কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবন— সবখানেই এক ধরনের বড় দেয়াল তৈরি করে।
জাপান সফরে এসে গাড়ি ব্যবসায়ী মাইনুলের সঙ্গে কয়েক দফা কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ভাষা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ যা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। কারণ এখানে এক গ্লাস পানি খাওয়ারও সুযোগ নেই ভাষা জানা ছাড়া।
কেননা জাপানিরা সাধারণত ইংরেজিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তাই স্থানীয়দের সঙ্গে ব্যবসা বা চুক্তি করার জন্য জাপানি ভাষা জানা আবশ্যক। প্রথমদিকে আমি জাপানি ভাষা না পারায় জাপানিজদের অনুসরণ করতে থাকি। তাদের চলনবলন, কথাবার্তা, কালচার রপ্ত করতে থাকি। উপযাচক হয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতাম। মানে আমি তাদের ভাষা শিখতে চাই সেই আগ্রহ প্রকাশ করতাম। কিন্তু ইদানীং দেখা যায়— নতুন প্রবাসীদের ভাষা শেখার আগ্রহই নেই। এ জন্যই জাপানে আসা প্রবাসী শ্রমিক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী সবাই একই বিড়ম্বনার শিকার হন। মর্যাদাপূর্ণ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজ জানা থাকলেও শ্রমবাজারে তারা পিছিয়ে পড়েন।
ওসাকা উপসাগরের তীরে অবস্থিত জাপানের বন্দরনগরী কোবে শহরে থাকেন আশিক খন্দকার। সাড়ে চার বছর ধরে জাপান থাকেন তিনি। আশিকের সঙ্গে গতকাল জাপানের রাজধানী টোকিওর নিউ ওতানি হোটেলে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি ওই হোটেলে আয়োজিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতবিনিময় সভায় যোগ দিতে টোকিওতে এসেছেন।
ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী হলেও জাপানে সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা খণ্ডকালীন চাকরি করছেন নরসিংদীর আশিক। ঘণ্টায় ১ হাজার ইয়েনের মতো আয় হয় তার। আশিক বলেন, আমি জাপানে এসেই জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ একাডেমিতে ভর্তি হই। জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স শেষ করে কোবে শহরে ইউনিভার্সিটি অব মার্কেটিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সায়েন্সে ভর্তি হই। দ্বিতীয় বর্ষের শেষ সেমিস্টারে আছি।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে যারা আগামী বছর এপ্রিল সেশনে আসবেন স্টুডেন্ট ভিসায়, তারা সর্বোচ্চ এন-৫টা শেষ করে কোনো রকম এন-৪টা রানিং করে আসেন। রানিংয়ের সময় যখন তারা জাপানে আসেন, তাদের লেভেল থাকে এন-৫ লেভেল।
জাপানি ভাষা শেখার ৫টি স্তর
এন-৫ (শুরুর স্তর) : মৌলিক ব্যাকরণ, হিরাগানা, কাতাকানা এবং কিছু সাধারণ কাঞ্জি ও পরিচিত বাক্যাংশ বোঝা যায়।
এন-৪ (প্রাথমিক স্তর) : দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কথাবার্তা এবং সহজ বাক্য বা লেখা বুঝতে পারা যায়।
এন-৩ (মধ্যম স্তর) : দৈনন্দিন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু জটিল বিষয়বস্তু ও কথোপকথন কিছুটা সহজে সামাল দেওয়া যায়।
এন-২ (উচ্চ-মধ্যম স্তর) : ব্যবসা-বাণিজ্য, পত্রিকা বা দৈনন্দিন জীবনের বিস্তৃত পরিসরে জাপানি ভাষা সাবলীলভাবে বোঝা যায়।
এন-১ (উন্নত স্তর) : জটিল ও উচ্চমার্গীয় বিষয়, শিক্ষামূলক বা পেশাদার স্তরে নেটিভ স্পিকারদের মতো সম্পূর্ণ সাবলীলভাবে জাপানি ভাষা বুঝতে পারা যায়।
শিক্ষার্থী আশিক বলেন, আমার দৃষ্টিতে জাপানে যারা নতুন আসেন বাংলাদেশ থেকে স্টুডেন্ট ভিসায় কিংবা ওয়ার্ড স্কিল ভিসায়, তারা সর্বপ্রথম যেটা ভুল করেন সেটা হচ্ছে জাপানিজ ভাষা। এন-২ লেভেলে কোর্স সম্পন্ন করা থাকলে জাপানিজের সঙ্গে কমিউনিকেশনটা ভালো করতে পারবেন। পাশাপাশি জাপানের কাজকর্ম কিংবা আপনার লাইফস্টাইলটা চেঞ্জ হয়ে যাবে। আপনি ভালো পজিশনে জব করতে পারবেন, পার্টটাইম জব করেন কিংবা আপনি ফুলটাইম জব করেন। মোটকথা আমরা যেখানে অদক্ষ, সেটা হলো— ভাষা। জাপানি ভাষা না জানা থাকলে কাস্টমারের সঙ্গে কথা বলা যায় না। জাপানিরা ইংরেজি তেমন পারে না। ভাষা জানা না থাকলে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কষ্টের কাজ করতে হয়। অর্থাৎ নিম্নপর্যায়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ কম বেতনের কাজ দেওয়া হয়। স্বাভাবিক একটা শপিংমল শোরুমে বা রেস্টুরেন্টেও কাজ দেওয়া হয় না। অথচ ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি, নেপালিসহ অন্যরা ভালো কাজ পায় জাপানে।
টোকিও শহরের শিনওকোবে এলাকায় মেট্রোরেলে কথা হয় সাফরুন নাহারের সঙ্গে। মাস কয়েক হলো জাপান এসেছেন স্টুডেন্ট ভিসায়। এখানকার ভাষা তেমন জানা নেই। সঙ্গে থাকা বান্ধবীই তার ভরসা। বান্ধবী লুৎফন নুহা কয়েক বছর হলো একটি রেস্টুরেন্টে রিসিপশনে কাজ করছেন। কিন্তু জাপানি ভাষা না জানায় খণ্ডকালীন তেমন কিছু করতে পারছেন না নবাগত সাফরুন।
জাপানের সাইতামা এলাকায় থাকেন জাহিদুল ইসলাম। কাজ করেন জাপানের বড় শপিং ডন কিহোতে ফ্লোর ম্যানেজার হিসেবে। বছর কয়েক হলো তিনি ইঞ্জিনিয়ার ভিসায় জাপান এসেছেন।
জাহিদুল জানান, জাপানি ভাষা শেখার কোনো বিকল্প নেই। জাপানিরা তাদের ভাষাকে খুবই গুরুত্ব দেন। আপনি কত দক্ষ তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো জাপানি ভাষা কতটা জানেন। ভাষা না জানা থাকলে আপনি তাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করছেন না। শুধু অর্থ আয়ের জন্য আসছেন। যা জাপানিজরা ভালোভাবে নেয় না।
অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, জাপানের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনাময় খাত। জাপানের চাহিদা মূলত দক্ষ শ্রমিকের। সে জন্য আমাদের দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে হবে, ভাষা শিক্ষা দিতে হবে। ভাষা না বুঝলে এখানে কোনো কাজ করা সম্ভব না।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমএস) ড. সেলিম রেজা মনে করেন, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যাগত সুবিধাকে টেকসই কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা যায়নি। এর অন্যতম কারণ দক্ষতা, জাপানি ভাষাজ্ঞান ও চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি। জনশক্তি রফতানিকে দক্ষতা নয়, সংখ্যার হিসাবে মাপা; নীতিগত ব্যর্থতা, দূরদর্শিতার অভাব এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়তে ব্যর্থ হওয়া।
সরকারের উদ্যোগ
জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় জেটরোর সহযোগিতা চেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপান সফরে সেই দেশের এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেটরো) প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমুর সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান এই সহযোগিতা চান।
এ ছাড়া জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি ভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। স্কুলে জাপানিসহ তৃতীয় ভাষা চালুর পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেছেন, ‘কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, জাপানি ভাষা শিক্ষা এবং দেশটির সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে পাঠানোর চেষ্টা করা হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।’
জাপানি ভাষায় দক্ষ প্রবাসীদের দেশে কাজে লাগানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও আগ্রহী হতে হবে। জাপানি ভাষার শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও প্রত্যাশার তুলনায় কম আবেদন পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভাষা নিয়ে প্রবাসীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাপানি ভাষায় দক্ষ প্রবাসীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় অথবা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এ বিষয়ে সম্ভাব্য উদ্যোগ নেওয়ার পথ খুঁজে দেখা যেতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম সময়ের আলোকে বলেন, জাপানে যাওয়ার আগেই সেই দেশের ভাষা পুরোপুরি জানাটা অত্যন্ত জরুরি। নেপালের লোকজন ভাষার শেখার এন-৩ ধাপ শেষ করে জাপান যায়। আর আমাদের দেশের লোকজন কোনোমতে এন-৫ ধাপ শেষ করে জাপান চলে যায়। স্টুডেন্টরা সেখানে গিয়ে খণ্ডকালীন জব করে। এতে তারা জাপানি ভাষা শেখার পর্যাপ্ত সময়ও পাচ্ছে না। ভাষা শেখায় মনোযোগ দিতে পারছে না।
তিনি বলেন, প্রতি বছর জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠানোর যে কথা বলা হচ্ছে, যদি ভাষাজ্ঞান না থাকে তা হলে সেটি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে। আমি মনে করি প্রয়োজনে জাপানি প্রশিক্ষক বাংলাদেশে এনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে সরকার।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি