কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একটি রিসোর্ট ভবন। ছবি : সংগৃহীত কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পে বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে গড়ে ওঠা হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন, নির্মাণবিধি ও কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাইয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) তৎপরতায় বিনিয়োগকারীদের একাংশের মধ্যে এই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের প্রশ্ন, পর্যটন অবকাঠামোর অনিয়ম দূর করার উদ্যোগ কি পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে নেওয়া হচ্ছে, নাকি বৈধ বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়ছে?
মেরিন ড্রাইভের উখিয়া উপজেলার ইনানী এলাকার ‘বে হিলটন বিচ রিসোর্ট’-এর মালিক শহীদুল হকের দাবি, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণের অনুমতি নিয়েই তারা হোটেল নির্মাণ করেছেন। তার ভাষ্যমতে, ভবন নির্মাণে প্রায় ৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। অথচ দীর্ঘদিন পর কউকের পক্ষ থেকে ভবনটিকে ‘সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করার বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। এতে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
তিনি আরও দাবি করেন, ৬ কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা চারতলা নির্মাণাধীন হোটেলটি ভেঙে দিয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে কউকের নোটিসে ভবনটির নির্মাণ অনুমোদন না নেওয়া, নির্মাণকাজ শুরুর সময় নিয়ে অসংগতি এবং সরেজমিন পরিদর্শনে কাঠামোগত ত্রুটি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভবনটির নিরাপত্তা যাচাইয়ে কারিগরি ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথিও চেয়েছে সংস্থাটি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে?
এ বিষয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি বলেন, অবৈধভাবে নির্মিত ভবনটি মালিকপক্ষকে নিজ উদ্যোগে ভেঙে ফেলতে চারবার নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে আড়াই হাজারের মতো স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে দুই শতাধিক। এসব স্থাপনার বেশিরভাগেরই বৈধ অনুমোদন নেই। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সেখানে বিপুলসংখ্যক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। জসিম উদ্দিন আরও বলেন, বারবার নোটিস করার পরও অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে না নেওয়ায় যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। মেরিন ড্রাইভে অবৈধ কোনো স্থাপনা রাখতে দেওয়া হবে না।
অনুমোদন নিয়েই ভবন নির্মাণের দাবি : বে হিলটন বিচ রিসোর্টের মালিক শহীদুল হক কউকের চেয়ারম্যানের কাছে ২৬ অক্টোবর দেওয়া এক লিখিত জবাবে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট জমির মূল মালিক ছিলেন জাকির হোসেন। ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে কহিনুর শওকত জমিটির মালিকানা লাভ করেন। পরে তার নামে পৃথক নামজারি খতিয়ানও সৃজন করা হয়। মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটির নকশা অনুমোদন করে।
একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়। ওই অনুমোদনের ভিত্তিতেই ভবন নির্মাণ শুরু হয়। পরে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট নিবন্ধিত ১৫৩২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে কহিনুর শওকত ওই ভবন ও সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি শহীদুল হকের কাছে বিক্রি করেন। এরপর তার নামে নামজারি করা হয় এবং নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে আসছেন বলে কউককে দেওয়া জবাবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
শহীদুল হক দাবি করেন, কউকের নির্দেশে অনুমোদিত নকশা দাখিল করা হয়েছিল। নকশার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কউক জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের কাছে তথ্য চাইলে পরিষদ ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি লিখিতভাবে নকশার সত্যতা নিশ্চিত করে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১ জুলাই পরিবেশ অধিদফতর থেকে অনাপত্তি সনদ নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে ইউনিয়ন পরিষদের নকশা অনুমোদন ও পরিবেশগত অনাপত্তি সনদ থাকলেই কউকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা জাতীয় ভবন নির্মাণবিধি (বিএনবিসি) অনুসরণের সব শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও কারিগরি যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে বলে জানায় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
কউকের নোটিসে যা বলা হয়েছে : কউকের ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিসে ইনানীর রয়্যাল টিউলিপের পাশের ওই বহুতল ভবনের নির্মাণ অনুমোদন ও নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। এতে ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর নকশা প্রদর্শনের নোটিস, ১৯ নভেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিস এবং ৭ ডিসেম্বর চূড়ান্ত নোটিস দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। নোটিসে বলা হয়, ভবনটির নির্মাণকাজ ২০১৮ সালের আগে শুরু হয়নি বলে সরেজমিন তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। এ কারণে বিএনবিসি ২০২০-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী কউকের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে কর্তৃপক্ষ মনে করছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট কউক সদস্যের (প্রকৌশল) নেতৃত্বে একটি দল ভবনটি পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে ভবনের বিভিন্ন অংশে দৃশ্যমান কাঠামোগত ত্রুটি, বিচ্যুতি ও অন্যান্য অসংগতি পাওয়া গেছে বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়। এসব কারণে ভবনটির স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হবে না কেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কারিগরি ব্যাখ্যা, কাঠামোগত বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন প্রতিবেদন, প্রত্যয়নপত্র এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুরোনো অনুমোদন বনাম নতুন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার : শহীদুল হকের যুক্তি, ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট এলাকা কউকের আওতাভুক্ত ছিল না। সে সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ থেকেই নকশা অনুমোদন ও নির্মাণের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিন পর ওই অনুমোদনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার উদ্যোগ আইনগতভাবে কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছেন। তবে কউকের নোটিসে স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবরের একটি চিঠির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও ব্যবহার সনদ প্রদান বিধিবহির্ভূত উল্লেখ করা হয়েছে বলে নোটিসে বলা হয়।
শুনানির আগে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ : বে হিলটন বিচ রিসোর্টের মালিকপক্ষের অভিযোগ, কউকের কাছে অভিযোগ জানানো এবং শুনানির প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই ২৬ অক্টোবর ভবনটিতে ভাঙচুর বা অপসারণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা : পর্যটন খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের টেকসই উন্নয়নে নিরাপদ অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ— সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। অননুমোদিত নির্মাণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অনুমোদনপ্রাপ্ত স্থাপনার নথি যাচাই, ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বে হিলটন বিচ রিসোর্টের মালিক শহীদুল হক তার লিখিত জবাবে জানিয়েছেন, ভবনটি মাস্টারপ্ল্যানের মৌলিক লক্ষ্যের পরিপন্থী প্রমাণিত হলে কউকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে তিনি প্রস্তুত। একই সঙ্গে ভবনটির কাঠামোগত অবস্থা নিরপেক্ষ প্রকৌশলীর মাধ্যমে পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখাও কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনিয়ম থাকলে সমাধান চান বিনিয়োগকারীরা : মেরিন ড্রাইভ এলাকায় হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণে অনিয়ম বা অসংগতি নেই, এমন দাবি করছেন না পর্যটন খাতের বিনিয়োগকারীরা। তাদের বক্তব্য, কোনো ভবনে অনুমোদন-সংক্রান্ত ঘাটতি, নকশার বিচ্যুতি কিংবা নিরাপত্তার সমস্যা থাকলে তা অবশ্যই আইন অনুযায়ী সমাধান করতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগ, কারিগরি মূল্যায়ন এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের দাবি, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনার অনেকেই স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের মধ্যেই নির্মিত হয়েছে। ফলে এখন একযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্রতিটি স্থাপনার অনুমোদন, নির্মাণের সময়কাল ও নিরাপত্তার অবস্থা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
টুকটুক রিসোর্টে দুর্ঘটনার পর তৎপরতা : সম্প্রতি মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেকে টুকটুক রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১১ জনের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনার পর পর্যটন স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা, ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব, জরুরি নির্গমনপথ এবং অনুমোদন-সংক্রান্ত শর্ত কঠোরভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। তবে একটি দুর্ঘটনার পর সব স্থাপনার বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকির মাত্রা, আইনগত অবস্থান ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে পৃথকভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীদের একাংশ।
তাদের আশঙ্কা, পর্যটন খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে নতুন বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি