এম. পলাশ শরীফ, মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট)
সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে মোরেলগঞ্জের জেলেরা। ছবি : সময়ের আলোমা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত (২৯ অক্টোবর) রাত ১২টায়। নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের জেলেরা। জাল, নৌকা ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ট্রলারে ওঠার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন এ পেশার হাজারো মানুষ। তবে সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি ঋণের বোঝা ও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা না পাওয়ার দুশ্চিন্তাও রয়েছে তাদের।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবারপ্রতি মাত্র ২৫ কেজি চাল খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়। এ সহায়তার তালিকা থেকেও বাদ পড়েন অনেক প্রকৃত জেলে। অন্যদিকে, পেশার সঙ্গে যুক্ত নন—এমন ব্যক্তিরাও সহায়তা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের। এ অবস্থায় ঋণের চাপ কমাতে বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা এবং খাদ্যসহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন জেলেরা।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোরেলগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নসহ গাবতলা, খাউলিয়া, কুমারখালী, আমতলী, ফাসিয়াতলা, পুটিখালী, সোনাখালী, বলইবুনিয়া, শ্রেণীখালী, বহরবুনিয়া, ফুলহাতা, চিংড়াখালী ও চণ্ডীপুর পশুরিপাড়া এলাকায় ৮ থেকে ১০ হাজার জেলে পরিবার রয়েছে। বংশপরম্পরায় এ পেশায় যুক্ত এসব মানুষের জীবিকা মূলত সাগরে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল।
জেলেরা জানান, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য মৎস্য আড়তের মহাজনদের কাছ থেকে ট্রলারপ্রতি ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন নিতে হয়। প্রতিটি ট্রলারে ১৫ থেকে ২০ জন জেলেকে আগাম টাকা দিয়ে কাজে নিতে হয়। জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়লে কিছু টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন তারা। মাছ কম হলে ঋণের বোঝা আরও বাড়ে।
তাদের অভিযোগ, মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া প্রতি লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে ১০ হাজার টাকা কমিশন দিতে হয়। ফলে মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে অনেক বছরই পুরো ঋণ শোধ করা সম্ভব হয় না। এমনকি কোনো জেলে মারা গেলেও তার পরিবারের সদস্যদের সেই দেনার বোঝা বহন করতে হয়।
গাবতলা গ্রামের জেলে গিয়াস তালুকদার, আব্দুল গফ্ফার তালুকদার, ওহিদুল শেখ, রুহুল আমিন আঁকন ও রুবেল তালুকদারসহ কয়েকজন জানান, তাদের গ্রামে প্রায় ২০০ পরিবার জেলে পেশায় নিয়োজিত। ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে তারা বংশপরম্পরায় সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
তাদের ভাষ্য, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় পরিবারপ্রতি ২৫ কেজি চালের সরকারি সহায়তা দেওয়া হলেও তাদের গ্রামের মাত্র ৫৬টি পরিবার এ তালিকায় রয়েছে। অথচ পেশাদার অনেক জেলে সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রতি বছর তালিকা পরিবর্তন করা হলেও প্রকৃত জেলেদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না বলে অভিযোগ তাদের। পেশাদার জেলেদের সঠিক তালিকা তৈরি করে খাদ্যসহায়তা বাড়ানো এবং ব্যাংকের মাধ্যমে বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার দাবি জানান তারা।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, মোরেলগঞ্জে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৭ হাজার। এর মধ্যে নদ-নদী ও সাগরে মা ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলে ২ হাজার ১২৭ জন, জাটকা ধরা থেকে বিরত থাকা জেলে ৩ হাজার ৪০০ জন, সমুদ্রগামী জেলে পরিবার ১ হাজার এবং বনজীবী জেলে বিএলসি লাইসেন্সধারী ৪২ জন। বিভিন্ন শ্রেণিতে এসব জেলে পরিবার খাদ্যসহায়তার আওতায় রয়েছে।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রনজিৎ কুমার বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আজ রাত ১২টায় শেষ হবে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ২৬টি অভিযান ও একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় দুজনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মা ইলিশ সংরক্ষণে বিরত থাকা ২ হাজার ১২৭টি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছে। জেলে পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নে রেশন ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাবিবুল্লাহ বলেন, জেলেদের বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাবটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় উত্থাপন করে রেজুলেশন করা হবে। পাশাপাশি বিষয়টি প্রস্তাব আকারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
সময়ের আলো/জোই