প্রাচীন চীন সম্রাটের সমাধিতে হাজারো টেরাকোটা সৈন্যের একাংশ। ছবি : সংগৃহীত চীনের প্রথম সম্রাট ছিন শি হুয়াংয়ের সমাধিতে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে হাজারো মাটির সৈন্য। কারও হাতে অস্ত্র, কারও পরনে বর্ম, কারও মাথায় সামরিক পদমর্যাদা সংবলিত বিশেষ টুপি। প্রায় আট হাজার টেরাকোটা যোদ্ধার এই বাহিনী তৈরি হয়েছিল সম্রাটের মৃত্যুর পর তাকে পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। দুই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এই সৈন্যদের আবিষ্কার হয় ১৯৭৪ সালে।
কিন্তু এত বড় একটি বাহিনী যারা তৈরি করেছিলেন, তাদের পরিচয় সম্পর্কে এত দিন খুব বেশি কিছু জানা যায়নি। এবার সেই অজানা ইতিহাসের সূত্র মিলেছে সৈন্যদের শরীরে রয়ে যাওয়া আঙুলের ছাপ থেকে। আর তাতে দেখা যাচ্ছে, সম্রাটের এই বিশাল বাহিনী তৈরিতে শুধু পুরুষ কারিগররাই ছিলেন না; কাজ করেছেন নারী ও শিশুরাও। তথ্যসূত্র : জার্নাল অব কালচারাল হেরিটেজ ও স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন।
সম্প্রতি চীনের প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। সম্রাট ছিন শি হুয়াংয়ের সমাধিস্থল জাদুঘর ও শানডং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা টেরাকোটা সৈন্যদের গায়ে থাকা ৭৯টি আঙুলের ছাপ বিশ্লেষণ করেছেন। ৩৬টি মূর্তি থেকে সংগ্রহ করা এসব ছাপের ভিত্তিতে তারা প্রাচীন এই নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিকদের বয়স ও লিঙ্গ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্লেষণ করা ছাপের ৪৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের, ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারীর এবং ২২ দশমিক ৩ শতাংশ ১৫ বছরের কম বয়সিদের হতে পারে। অর্থাৎ নমুনায় পাওয়া ছাপের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও কিশোরদের বলে ধারণা করছেন গবেষকরা।
আঙুলের ছাপের গল্প : কাঁচা মাটির কোনো বস্তু হাতে তৈরি করার সময় তাতে আঙুলের ছাপ পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। গবেষকরা সমাধির প্রথম খননক্ষেত্রের একটি নির্দিষ্ট অংশ, টি২৩ ইউনিট থেকে পাওয়া মূর্তিগুলো পরীক্ষা করেন। সেখানে মোট ৯১টি আঙুলের ছাপ শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে একই ব্যক্তির একাধিক ছাপ থাকার সম্ভাবনা থাকায় ১২টি বাদ দেওয়া হয়। বাকি ৭৯টি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ছাপ বিশ্লেষণে রাখা হয়। প্রতিটি মূর্তিতে এক থেকে পাঁচটি পর্যন্ত ছাপ পাওয়া গেছে।
এসব ছাপের ৭৩টি পড়েছিল মূর্তি গড়া, আকৃতি দেওয়া ও বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানোর সময়। অধিকাংশ পাওয়া গেছে সৈন্যদের মাথা ও হাতের অংশে। বাকি ছয়টি ছাপ ছিল সাজসজ্জার কাজে, বিশেষ করে বর্মের ছোট ছোট অলংকার, পেরেকসদৃশ অংশ ও কোমরবন্ধ বসানোর জায়গায়। অর্থাৎ আঙুলের ছাপগুলো শুধু কারিগরদের উপস্থিতির প্রমাণ নয়, মূর্তি তৈরির কোন কোন পর্যায়ে তাদের হাতের স্পর্শ লেগেছিল, সে সম্পর্কেও ধারণা দেয়।
আট হাজার মূর্তি, বিশাল কর্মযজ্ঞ : এই গবেষণার তাৎপর্য বুঝতে হলে টেরাকোটা সৈন্য তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। সম্রাটের সমাধিতে পাওয়া মূর্তিগুলো একজন শিল্পীর হাতে একেকটি করে তৈরি হয়নি। এগুলোর নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল নানা কৌশল। মাথা, হাত, পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে তৈরি করে পরে সেগুলো জোড়া লাগানো হতো। কিছু অংশ তৈরি করা হতো ছাঁচে, আবার শরীরের বিভিন্ন অংশের আকৃতি দিতে ব্যবহার করা হতো হাতের কাজ। এরপর মূর্তির গায়ে সূক্ষ্ম নকশা ও বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা হতো।
শুরুতে মোটা ও দানাদার মাটি দিয়ে মূর্তির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করা হতো। কিছুটা শুকিয়ে এলে তার ওপর লাগানো হতো অপেক্ষাকৃত মিহি মাটির স্তর। তারপর কারিগররা ফুটিয়ে তুলতেন চোখ, নাক, ঠোঁট, চুল, গোঁফ, দাড়ি, পেশি ও পোশাকের ভাঁজ। বর্মের প্রতিটি অংশ, কোমরবন্ধ, জুতার নকশা এবং মাথার সাজসজ্জাতেও ছিল সূক্ষ্ম কাজ। সবশেষে মূর্তিগুলো শুকিয়ে আগুনে পোড়ানো হতো। পোড়ানোর পর সেগুলোতে রং করা হতো। অনেক মূর্তির সঙ্গে রাখা হয়েছিল বাস্তব অস্ত্রও।
যুক্তরাষ্ট্রের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টের একটি গবেষণামূলক নিবন্ধে টেরাকোটা সৈন্য তৈরির এই বিভিন্ন পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মূর্তির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হওয়ার পর মিহি মাটির সাহায্যে চুল, দাড়ি, চোখ, মুখ, পেশি, পোশাক ও বর্মের খুঁটিনাটি ফুটিয়ে তোলা হতো। এই শেষ পর্যায়ের কাজেই মূর্তিগুলো পেয়েছে আলাদা চেহারা ও বৈশিষ্ট্য।
এত বিপুলসংখ্যক মূর্তি তৈরির জন্য যে সুসংগঠিত উৎপাদনব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল, তারও প্রমাণ মিলেছে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায়। ২০১৭ সালে অ্যান্টিকুইটি সাময়িকীর প্রকাশিত একটি গবেষণায় মূর্তিগুলোর মাটির উপাদান, তৈরির কৌশল ও অন্যান্য মৃৎশিল্পের সঙ্গে তুলনা করে দেখা হয়, কীভাবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছিল। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষকদের অংশগ্রহণে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, টেরাকোটা সৈন্য তৈরির মাটি সমাধিস্থলের কাছাকাছি এলাকা থেকেই সংগ্রহ করা হতো। পরে মাটি কেন্দ্রীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন স্থানীয় কর্মশালায় সরবরাহ করা হতো।
গবেষকদের মতে, এই ব্যবস্থায় শ্রমবিভাজন ও কারিগরি বিশেষায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কোনো কর্মশালায় মাটি প্রস্তুত বা প্রক্রিয়াজাত করা হতো, অন্য কোথাও তৈরি হতো মূর্তির বিভিন্ন অংশ। আবার কিছু কারিগর সেগুলো জোড়া লাগানো, আকৃতি দেওয়া কিংবা সাজসজ্জার কাজ করতেন। এভাবে একাধিক কর্মশালা ও শ্রমিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল বিশাল বাহিনী। অর্থাৎ এটি কোনো একদল ভাস্করের বিচ্ছিন্ন শিল্পকর্ম ছিল না; বরং সম্রাটের প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি বৃহৎ উৎপাদন প্রকল্প।
নারী ও শিশুদের কাজের ইঙ্গিত : নতুন গবেষণায় নারী ও কিশোরদের অংশগ্রহণের যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে প্রাচীন চীনের আরও কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শনের মিল রয়েছে। ছিন রাজবংশের সময়কার বার্নিশ করা সামগ্রী বা ল্যাকারওয়্যারে পাওয়া বিভিন্ন লিপিতে নারী ও অল্পবয়সি শ্রমিকদের পরিচয়ের উল্লেখ রয়েছে। হুবেই প্রদেশে পাওয়া এসব নিদর্শনে ‘প্রাপ্তবয়স্ক নারী’, ‘তরুণী’ এবং ‘ছোট ছেলে’ বোঝায় এমন শব্দ পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এসব লেখা থেকে বোঝা যায়, সে সময় রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত উৎপাদনকাজে নারী ও শিশুরাও যুক্ত ছিলেন। যদিও এগুলো টেরাকোটা সৈন্য তৈরিতে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ নয়, তবু প্রাচীন চীনের কারিগরি শ্রমে তাদের উপস্থিতির ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে।
কিশোরদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষানবিশপ্রথা। ছিন রাজবংশের আইন ও প্রশাসনিক নথিতে কারিগরদের অধীনে তরুণদের কাজ শেখার ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ দক্ষ কারিগরের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ধীরে ধীরে কাজে দক্ষ হয়ে উঠার সুযোগ ছিল তাদের। নতুন গবেষণার লেখকরা মনে করেন, টেরাকোটা সৈন্য তৈরির কাজেও ১৫ বছরের কম বয়সি কিছু শ্রমিক শিক্ষানবিশ বা সহকারী হিসেবে যুক্ত থাকতে পারেন। তারা হয়তো অভিজ্ঞ কারিগরদের তত্ত্বাবধানে তুলনামূলক সহজ কাজ করতেন। বর্মের সাজসজ্জা বসানো, ছোট অংশ ধরে রাখা কিংবা মাটি মসৃণ করার মতো কাজে তাদের ভূমিকা থাকতে পারে।
১৯৭৪ সালে আবিষ্কারের পর থেকে টেরাকোটা সেনাবাহিনী নিয়ে গবেষণায় নতুন নতুন তথ্য সামনে এসেছে। প্রথমে সবাই ভেবেছিলেন, সম্রাটের সমাধিতে মাটির সৈন্যদের একটি বাহিনীই শুধু পাওয়া যাবে। পরে আবিষ্কৃত হয়েছে বেসামরিক কর্মকর্তা, অ্যাক্রোব্যাট, সংগীতশিল্পী, ঘোড়া, রথ এবং বাদ্যযন্ত্রের সুরে মগ্ন জলচর পাখির মূর্তিও। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখন মনে করেন, সমাধিটি ছিল সম্রাটের জীবদ্দশার রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি ভূগর্ভস্থ প্রতিরূপ। সেখানে শুধু সামরিক বাহিনী নয়, তার সাম্রাজ্যের নানা দিক তুলে ধরার আয়োজন ছিল।
সম্রাট ছিন শি হুয়াংয়ের সেই ভূগর্ভস্থ সাম্রাজ্যে আজও দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার টেরাকোটা সৈন্য। তাদের মুখের আদল, পোশাক কিংবা বর্ম দেখে অনেক কিছু জানা গেলেও যারা তাদের তৈরি করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই ইতিহাসে রয়ে গেছেন অচেনা। কোনো নাম নেই, নেই ব্যক্তিগত পরিচয়ের দলিল। কিন্তু মাটির গায়ে থেকে যাওয়া আঙুলের ছাপ জানিয়ে দিচ্ছে, এই বিশাল নির্মাণকাজে একাধিক বয়স ও লিঙ্গের মানুষের হাত ছিল। সম্রাটের পরকালীন সাম্রাজ্য গড়তে যাদের শ্রম লেগেছিল, তাদের মধ্যে নারী ও কিশোরদের উপস্থিতিও হয়তো ছিল উল্লেখযোগ্য। দুই হাজার বছরের বেশি সময় পর সেই অদৃশ্য কারিগরদের খুঁজে পাওয়ার প্রথম জৈবিক সূত্র হয়ে উঠেছে তাদেরই ফেলে যাওয়া ক্ষুদ্র আঙুলের ছাপ।
সময়ের আলো/ প্রিন্ট/কেএইচও