শিক্ষার পথে মৃত্যুঝুঁকি, গাজায় স্কুলে যেতেও ভয় শিশুদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গাজায় কয়েক বছর পর আবারও স্কুলে ফিরেছে শিশুরা। তবে শ্রেণিকক্ষে ফেরার আনন্দের বদলে তাদের সঙ্গী হয়েছে আতঙ্ক। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে

2026-10-31T16:26:13+00:00
2026-10-31T16:26:13+00:00
 
  শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
শিক্ষার পথে মৃত্যুঝুঁকি, গাজায় স্কুলে যেতেও ভয় শিশুদের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:২৬ পিএম 
রিয়াদ হামাদ ও তার পরিবার ১৪ বছর বয়সী মোহাম্মদের ছবি এবং তার স্কুলের সনদপত্রগুলো ধরে আছেন। ছবি : আব্দেলহাকিম আবু রিয়াশ/ আল জাজিরা]
গাজায় কয়েক বছর পর আবারও স্কুলে ফিরেছে শিশুরা। তবে শ্রেণিকক্ষে ফেরার আনন্দের বদলে তাদের সঙ্গী হয়েছে আতঙ্ক। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে ইসরায়েলি বোমা হামলা ও স্নাইপারের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরা। আহত হচ্ছে অনেকে। হামলার ভয় আর স্বজন হারানোর শঙ্কায় ব্যাহত হচ্ছে তাদের পড়াশোনা।

গত ১৭ অক্টোবর দেইর আল-বালাহ শহরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয় ১৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ হামাদ। আল-বারাকা এলাকায় ১০ বছর বয়সী ছোট ভাই আবদুল্লাহর সঙ্গে হাঁটার সময় তাদের চলার পথ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে মোহাম্মদসহ আরেক ব্যক্তি নিহত হন। বেঁচে যায় আবদুল্লাহ।

মোহাম্মদ ছিল রিয়াদ হামাদের তৃতীয় সন্তান। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ পড়াশোনায় ছিল মেধাবী; শ্রেণিতে তার ফলও ছিল ভালো। ছেলেকে হারানোর শোক কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না ৪৪ বছর বয়সী বাবা।

আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেইর আল-বালাহে পরিবারের তাঁবু থেকে রিয়াদ হামাদ বলেন, ‘সে শুধু আমার ছেলে ছিল না, আমার বন্ধুও ছিল। পড়াশোনায় খুব ভালো করছিল। আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন।’

ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে পরিবার। মোহাম্মদের পড়াশোনা ও সাফল্য ছিল তাদের গর্বের বিষয়। বাবা বলেন, ‘মোহাম্মদ প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করত, “আমি তোমার কাছে কেমন?” আল্লাহর কসম, আমি কখনো তার কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু চাইনি।’

ভাইকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে আবদুল্লাহও। এখন তার ভয়, বাবাকেও হারাতে হতে পারে। রিয়াদ বলেন, ‘সে এখন স্কুলে যেতে খুব ভয় পায়। আগে দুই ভাই প্রতিদিন একসঙ্গে স্কুলে যেত, আবার একসঙ্গেই ফিরত। এখন একা স্কুলে যাওয়ার বিষয়টি সে মেনে নিতে পারছে না।’

পরিবারটির মতো গাজার বহু মানুষের জীবন এখন আতঙ্কে কাটছে। রিয়াদ বলেন, ‘আমরা ভয়ের মধ্যে বাস করছি। রাস্তায় বের হলেও ভয় লাগে। হাঁটার সময় কিংবা গাড়িতে বসেও বুকের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে। আমাদের শিশুদের কেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এমন ভয় ও উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হবে? যথেষ্ট হয়েছে। সন্তানের বাবাকে দাফন করার কথা, বাবার সন্তানের লাশ দাফন করার কথা নয়। তারা সবকিছু উল্টে দিয়েছে।’

বহু বছরের বিঘ্নের পর অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ ও তাঁবুতে হলেও শিশুদের স্কুলে ফেরা গাজাবাসীর মধ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কিছুটা আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্নাইপারের গুলির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। 

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৫৭৪ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ৬৮৭ জন আহত হয়েছেন।

প্রায় তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধের কারণে বিঘ্নিত শিক্ষাকার্যক্রম ১৯ সেপ্টেম্বর গাজায় আবার শুরু হয়। তবে স্কুল খোলার পরও হামলা থামেনি। ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১০ শিশু ও একজন শিক্ষক নিহত হয়েছেন। 

গত রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ২১ অক্টোবর জাবালিয়ার মুরাদিয়া স্কুলে সকালের সমাবেশ চলাকালে দুই ছাত্রী আহত হয়। একই রোববার গাজা সিটির ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে হামলায় পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হয়, যাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শিক্ষার্থী, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

বিশেষ করে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছাকাছি স্কুলগুলোতে ঝুঁকি বেশি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে এই রেখা গাজার ভূখণ্ডকে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ভাগ করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, রেখাটি পশ্চিম দিকে সরে যাওয়ায় গাজার ৬৫ শতাংশের বেশি এলাকা এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে; এক বছর আগে চুক্তিতে এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ।

ইয়েলো লাইনের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত ৬৬ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। এ এলাকায় যাতায়াত করা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত ইসরায়েলি স্নাইপার ও বোমা হামলার ঝুঁকিতে থাকতে হচ্ছে।

গত ২১ অক্টোবর চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সুয়াদ আবদ রাব্বো স্কুলে গিয়েছিল বই-খাতা নিয়ে। কিছুক্ষণ পর তার বড় বোন বাড়িতে ছুটে এসে চিৎকার করে জানায়, সুয়াদ গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

সুয়াদের মা আলিয়া আবদ রাব্বো বলেন, ‘আমি খালি পায়ে দৌড়ে বেরিয়ে যাই। মেয়েকে দেখে কী করব বুঝতে পারছিলাম না। সে রক্তাক্ত অবস্থায় কাঁদছিল, চিৎকার করছিল।’

সুয়াদের হাঁটুর ওপরের অংশে গুলি লাগে। গুলিটি স্নায়ু ও টেন্ডনের কাছাকাছি সংবেদনশীল স্থানে আটকে যায়। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, গুলি বের করতে গেলে পক্ষাঘাতের ঝুঁকি রয়েছে। অস্ত্রোপচার করা হলেও গুলিটি বের করা সম্ভব হয়নি। সেটি এখনো তার পায়ে রয়ে গেছে।

অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফেরার সময় সুয়াদ স্কুলের শ্রুতিলিখন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা একটি লেখা আবৃত্তি করতে শুরু করে। মা আলিয়া জানান, মেয়েটি বলছিল, ‘উদারতা ও সহনশীলতার প্রতীক... যখন ক্লান্ত বোধ করি, তখন বাড়ির উঠানের একটি জলপাইগাছের নিচে বসি। এতে ক্লান্তির পর স্বস্তি পাই।’

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও তাঁবুতে ফিরেছে সুয়াদ। এখনো সে হাঁটতে বা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। পুরোপুরি সুস্থ হতে বিদেশে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। কিন্তু গাজায় প্রবেশ ও বের হওয়ার ওপর ইসরায়েলের কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকায় তার উন্নত চিকিৎসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

আলিয়া বলেন, ‘সুয়াদ এখন খুব হতাশ। সে কাঁদে আর জিজ্ঞেস করে, “আমার সঙ্গে কেন এমন হলো? আমাকে কেন লক্ষ্যবস্তু করা হলো? আমি কী করেছি?”’

উত্তর গাজায় তাদের তাঁবুর কাছাকাছি এলাকায় নিয়মিত গুলি চালায় ইসরায়েলি ট্যাংক, সামরিক যান ও ক্রেন। বিশেষ করে সূর্যাস্তের পর পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ছিটকে আসা গুলি থেকে বাঁচতে পরিবারগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাটিতে শুয়ে থাকতে হয়।

জাবালিয়ায় যুদ্ধের সময় দেইর আল-বালাহে আশ্রয় নেওয়ার পর আবার বাড়িতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েও অনুশোচনা হচ্ছে আলিয়ার। তিনি বলেন, ‘মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর সময় আমার বুক কাঁপে। স্বামীকে বলেছি, দক্ষিণ থেকে ফিরে আসাটা ভুল হয়েছে।’

সেদিন সুয়াদের পাশাপাশি আরেক ছাত্রীও আহত হয়েছিল। মুরাদিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাঈম আলুশ জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখনই গুলির ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, ‘মেয়েরা দুই সারিতে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ একজন চিৎকার করে মাটিতে পড়ে যায়। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক মেয়ের পাশেও গুলি লাগে।’

শিক্ষকেরা ছুটে গিয়ে দেখেন, সুয়াদ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী আমিনা খাদরের পেটেও গুলি লাগে, তবে তার আঘাত ছিল তুলনামূলক সামান্য।

ঘটনার পর স্কুলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিভাবকেরা দ্রুত সন্তানদের নিয়ে যেতে স্কুলে ছুটে আসেন। যারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিল, সেই শিক্ষার্থীরাও ভয়ে ভেঙে পড়ে। পরবর্তী দিনগুলোতে স্কুলে অনুপস্থিতির হারও বেড়ে যায়।


জাবালিয়া আল-বালাদের পশ্চিমে আল-ঘুবরি এলাকায় ইয়েলো লাইনের কাছাকাছি অবস্থিত স্কুলটিতে ২০টি অস্থায়ী শিক্ষাকক্ষ রয়েছে। আশপাশের এলাকার প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা করে। প্রধান শিক্ষক আলুশের ভাষ্য, ইসরায়েলি কামান, কোয়াডকপ্টার ড্রোন ও স্নাইপারের ছোড়া গুলি বা গোলার অংশ প্রায়ই স্কুলে এসে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষা এখন হামলার মুখে, আমাদের পুরো জীবনই হামলার মুখে। যেকোনো মুহূর্তে গুলি শুরু হতে পারে। এটি হালকা গুলি নয়, বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে। প্রতিদিন স্কুলে আসার সময় বুকের ওপর হাত রেখে আসি—ভয় হয়, আমার কোনো শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষক গুলিবিদ্ধ হন কি না।’

সুয়াদের সঙ্গে আহত হওয়া আমিনাও এখনো সেই ঘটনার আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার বাবা খালেদ খাদর জানান, মেয়ের আহত হওয়ার খবর পেয়ে তিনি স্কুলে ছুটে যান এবং তাকে কাছের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান।

আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘সেখানে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। আমার মেয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল। চিৎকার করতে করতে ভেঙে পড়ে, পরে মাটিতে লুটিয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে সে নিরাপদ আছে। কিন্তু ওই ঘটনার মানসিক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে তার কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।’

এরপর থেকে আমিনা স্কুলে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। পরিবার একবার তাকে স্কুলে নিয়ে গেলেও গুলির শব্দ সহ্য করতে না পেরে সে আগেভাগেই বাড়ি ফিরে আসে। খালেদ বলেন, ‘এখন সে স্কুলকেই ভয় পায়। প্রায়ই স্বপ্নে দেখে, তার সহপাঠী রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে।’

স্কুলের আশপাশে ইসরায়েলি বিমান হামলা, নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও গোলাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় নিজের অন্য সন্তান ও স্ত্রীকেও নিয়ে উদ্বিগ্ন খালেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি না কী করব। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে তাদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করব, নাকি জেনেশুনে পাঠাব যে যেকোনো মুহূর্তে তারা হামলার শিকার হতে পারে? একজন শিক্ষার্থীর শেখার জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের কোনো স্থিতিশীলতা নেই, বিকল্পও নেই।’

সূত্র : আল জাজিরা  

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   শিক্ষা  মৃত্যুঝুঁকি  গাজা  স্কুল  শিশু 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: