নওগাঁর পাঁচজনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে

নওগাঁ প্রতিনিধি

সারাদেশ

সৌদি আরবের সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতের প্রায় তিনমাস পর নওগাঁয় বাকি পাঁচজনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে।শনিবার (৩১অক্টোবর) সকালে

2026-10-31T19:46:40+00:00
2026-10-31T19:46:40+00:00
 
  শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
সৌদি আরবে সোফা কারখানায় আগুন
নওগাঁর পাঁচজনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে
নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৪৬ পিএম 
মরদেহ পৌঁছানোর পর নিহতদের গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরবের সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতের প্রায় তিনমাস পর নওগাঁয় বাকি পাঁচজনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে। 

শনিবার (৩১অক্টোবর) সকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে মরদেহগুলো ফ্রিজিং গাড়িতে করে নওগাঁর নিজ নিজ গ্রামে এসে পৌঁছায়।  

এর আগে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে মরদেহগুলো সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে আসে।

মরদেহ পৌঁছানোর পর নিহতদের গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ জনের মধ্যে নওগাঁর বিভিন্ন এলাকার ১২ জন। বাকিদের মধ্যে নাটোর জেলার তিনজন এবং রাজশাহী জেলার একজন।

নিহত পাঁচজন হলেন- নওগাঁ শহরের পার-নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গপ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গপ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর প্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।

আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের দরিদ্র আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক (২৪)। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় ৫ লাখ টাকা ঋণ করে ৭ বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। সেখানে রিয়াদে সোফা কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতেন। ইচ্ছে ছিল অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে দেশে ফিরবেন। বিয়ে করে সংসার করার ইচ্ছে ছিলো। গত ৯ আগস্ট দুপুরে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে সেই স্বপ্ন নিভে যায়। 

এরপর সন্ধ্যায় অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়ার খবর জানতে পান পরিবারের সদস্যরা। এ খবর পাওয়ার পর থেকে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারে। বিকেল ৪টায় মিনহাজ প্রামাণিকের লাশের কফিন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। ছেলের লাশের কফিন বুকে জড়িয়ে বারবার বিলাপ করছেন ও মূর্ছা যাচ্ছেন। আগামীকাল রোববার নামাজে জানাজা শেষে কবরস্থ করা হবে। 

নিহত মিনহাজ প্রামাণিকের মা পারুল বিবি বলেন- পরিবারে সচ্ছলতার কথা ভেবে সাড়ে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে প্রায় ৭ বছর আগে সৌদি পাঠানো হয়েছিল। এরপর থেকে বৈশ্বিক সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে ছেলে টাকা পাঠাতে পারেনি। যা আয় করতে নিজে থাকা খাওয়া করতে শেষ হয়ে যায়। বাড়িতে কোন টাকা পাঠাতে পারতো না। এখন ছেলের এ অবস্থা। ঋণ পরিশোধ করা হবে কীভাবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। সরকারের কাছে দাবি ছেলের ঋণ পরিশোধসহ সহযোগিতা করা হোক।

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এ বছরের এপ্রিল মাসে সাড়ে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান নওগাঁ শহরের পার-নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা শাহিন। রেখে যান স্ত্রী, ৬ বছরের ছেলে সন্তান, ৮ মাস বয়সী মেয়ে এবং ৬০ ঊর্ধ্ব মাকে। বিদেশে পাড়ি জমানোর পাঁচ মাসের মাথায় শাহিনকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তার পরিবার এবং স্বজনরা। বারবার কান্না আর শোকে ভেঙে পড়ছেন শাহিনের মা নার্গিস বেগম। আত্মীয় স্বজনসহ প্রতিবেশীরাও অপেক্ষা করছেন শাহিনের মরদেহ এক নজর দেখার জন্য। 

নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগম বলেন, ছেলে শাহিন কল দিচ্ছিল, বলছিলাম বাবারে আমি কিছু ফল কিনে খাই জানিস তো তুই, আমাকে কিছু টাকা পাঠা। শাহিন বললো, মা ১২ তারিখে টাকা পাঠাবোনি, ফল কিনে খাইও। আর আমার ছেলেটা আগুনে পুড়ে মরে গেলো। আমার বুকের ধনটা আমাকে রেখে চলে গেলো। আমি তো একা হয়ে গেলাম, আমি এখন বাঁচবো কী করে। 

শাহিনের মামি নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, শাহিনের বয়স যখন চার বছর তখন তার বাবা মারা যায়। ছোট থেকেই অনেক কষ্ট করে শাহিন বড় হয়েছে। বিদেশে গিয়ে ভালো টাকা পয়সা হবে- এ আশায় বিয়ের পর সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে গেলো ছেলেটা। মারা যাওয়ার তিন দিন আগে প্রথম টাকা পাঠাইতে চাচ্ছিলো। ৩২ হাজার টাকা দিতে চাচ্ছিলো ১২ তারিখে, বলছিল ২০ হাজার টাকা দিয়ে কিস্তি পরিশোধ করতে এবং বাকি টাকা সংসারের কেনাকাটা করার জন্য। তাতেই ছেলেটা আগুনে পুড়ে মারা গেলো। 

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশী কর্মী মারা যান। এরমধ্যে অগ্নিকাণ্ডে নিহতেদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর গত ২৭ আগস্ট নয়জনের মরদেহ বাংলাদেশে আসে। নয়জনের মধ্যে নওগাঁর সাতজন। বাকিদের শরীর আগুনে পুড়ে যাওয়ায় শনাক্ত করতে বিলম্ব হয়। পরে বাকি সাতজনের মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে নওগাঁর পাঁচজন। মরদেহ বাংলাদেশে প্রেরণের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে শনিবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি ৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।

পরিবারের সচ্ছলতা ফিরাতে ধার-দেনা করে ৬-৮ বছর আগে নওগাঁর বিভিন্ন গ্রামের ১২ যুবক সৌদিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সৌদি আরবে রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় শ্রমিকের কাজ করছিলেন তারা। গত ৯ আগস্ট দুপুরে হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডে কারখানায় থাকায় ১৬ জন মারা যান। এ ঘটনার পর নিহতের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা চোখে-মুখে অন্ধকার দেখা শুরু করে। নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা।

স্থানীয়রা জানান- উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের যুবকেরা সৌদিতে কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি দিয়েছিলেন। যারা নিতান্ত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের। অনেকে ঋণগ্রস্ত। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা তারা। ঋণ পরিশোধে দুশ্চিন্তায় পড়েছে নিহতের পরিবার। ঋণ পরিশোধসহ ঘুরে দাঁড়াতে সরকারি সহযোগিতা দাবি এলাকাবাসীর।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিররুজ্জামান বলেন, পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওয়েজ অর্নার্স বোর্ডের সাথে সমন্বয় করে মরদেহগুলো দ্রুত দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিহতের পরিবারকে ইতোমধ্যে সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে। এছাড়াও আরও সহযোগিতা করা হবে বলে। 

সময়ের আলো/এনএন
  বিষয়:   সৌদি আরব  সোফা কারখানায় আগুন  নওগাঁ  পাঁচজনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: