ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে একজন ইসরায়েলি আরব ভোট দিচ্ছেন। ছবি : সংগৃহীত দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংস অপরাধ বৃদ্ধি এবং উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রীদের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ফিরেছেন অনেক আরব নাগরিক। নির্বাচনের এই ফল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধীদের সরকার গঠনের ক্ষেত্রে দল দুটিকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে রা’আম ও তিনটি আরব নেতৃত্বাধীন দলের জোট জয়েন্ট লিস্টকে ভোট দিয়েছেন প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষ। ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় এ সংখ্যা ৬৪ শতাংশ বেশি। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, ১২০ আসনের নেসেটে দল দুটি পেয়েছে ১৯টি আসন। এর আগে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সর্বোচ্চ আসন ছিল ১৫টি।
অতীতে ইসরায়েলের অনেক আরব নাগরিক নির্বাচনে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতেন। তাদের ধারণা ছিল, ভোট দিয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তবে বছরের পর বছর নিজেদের সম্প্রদায়কে উপেক্ষা ও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ এবং ক্রমবর্ধমান সহিংসতার প্রেক্ষাপটে এবার ভোটকেন্দ্রে ভিড় করেন তারা।
মঙ্গলবার রাতে নির্বাচনের বুথফেরত জরিপের ফল দেখার সময় সমর্থকদের উদ্দেশে রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস বলেন, ‘আমরা এখানে আছি, রাজনীতির প্রান্তে নই।’
এই ফল বিরোধী দলগুলোকে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট এবং অন্য বিরোধী নেতারা আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। ইসরায়েলের ইতিহাসে মাত্র একবার আরব নেতৃত্বাধীন কোনো দল সরকারে অংশ নিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছিলেন, তার বিরোধীরা আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছে। তবে আইজেনকোট তা অস্বীকার করেছিলেন।
নির্বাচনের পর নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা আরববিরোধী বক্তব্য আরও জোরালো করেছেন। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে ভোট দিতে বিদেশি শক্তি ভোটারদের ঘুষ দিয়েছে—এমন অভিযোগও তুলেছেন তারা, যদিও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহু আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, এতে ইসরায়েলের ‘ইসলামায়ন’ ঘটবে।
ক্ষোভ থেকেই ভোটকেন্দ্রে ফিরেছেন আরবরা
নেগেভ মরুভূমি থেকে উত্তর গ্যালিলি পর্যন্ত আরব অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকার ভোটকেন্দ্রে ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। নেগেভের বেদুইন গ্রাম তারাবিনে আগের দুই নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়েছিল। এবার সেখানে ভোটার উপস্থিতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং রা’আম পেয়েছে ৯৩ শতাংশ ভোট।
উত্তরের শহর সাখনিনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ইসরায়েলের মধ্যে সর্বোচ্চ—৮৭ শতাংশ। শহরটির মেয়র মাজেন ঘনাইম বলেন, আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংস অপরাধ বৃদ্ধি এবং নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী মিত্রদের উসকানিকে মোকাবিলায় ভোটাররা নির্বাচনকে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন।
রা’আমের সমর্থক ঘনাইম বলেন, ‘আমি আমার ভোটারদের হত্যা থেকে, সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার শিকার হওয়া থেকে এবং আরব চিকিৎসকদের হাসপাতালে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে চাই।’ আরব সম্প্রদায়ের ভেতরে সহিংসতা এবং সম্প্রতি আরববিরোধী হামলার ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি এ কথা বলেন।
ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের মধ্যে ভোটদানের অনীহা কাটাতে দলগুলো শহর ও গ্রামে প্রচার চালিয়েছে। যেসব এলাকায় ইহুদি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর প্রচার তুলনামূলক কম ছিল, সেসব এলাকায়ও তারা সভা করেছে। বেদুইন গ্রামগুলোতে নারীদের ভোট দিতে উৎসাহিত করতে তৃণমূল পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি প্রচার চালানো হয়েছে।
তবে ভোটার ও প্রার্থীদের ভাষ্য, এবার তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি নতুন আস্থার প্রতিফলন নয়; বরং নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর তাগিদ থেকেই তারা ভোট দিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী দুই মিত্র ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের নীতি এবং আরববিরোধী বক্তব্যও ভোটারদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। নির্বাচনের দিন আরব ভোটারদের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভির তার সমর্থকদের বলেছিলেন, ‘আপনারা যদি চান দেশটি ইহুদি ও জায়নবাদী থাকুক, তাহলে ভোট দিতে বেরিয়ে আসুন।’
নাজারেথে ভোট দেওয়ার পর ৫২ বছর বয়সী আওনি জোয়াবি বলেন, ‘আমরা দেখছি, সরকার দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা বাঁচতে চাই, আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ চাই, নিজেদের জন্যও ভবিষ্যৎ চাই।’
দুই দলের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা
ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের বড় অংশ ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় দেশটিতে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের বংশধর। ওই যুদ্ধে কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি বিতাড়িত হন বা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বর্তমানে ইসরায়েলের জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি আরব নাগরিক। তাদের ইসরায়েলি নাগরিকত্ব থাকলেও গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে অনেকের গভীর সংহতি রয়েছে।
রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট—দুই দলই নির্বাচনী প্রচারে আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে অপরাধ দমন এবং তাদের এলাকার উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বৃহত্তর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত মোকাবিলায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।
রা’আম নির্বাচনী প্রচারে জোট সরকারে অংশ নেওয়ার সম্ভাব্য সুবিধার ওপর জোর দিয়েছে। সম্ভাব্য ইহুদি মিত্রদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে—এমন বক্তব্য থেকেও দলটি বিরত ছিল। দলটির প্রার্থী তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রাখা হয়েছিল সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও ইয়েশ আতিদ পার্টির আইনপ্রণেতা ইয়োয়াভ সেগালোভিচকে।
অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের কয়েকজন নেতা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ এবং পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে অধিকাংশ ইহুদি ইসরায়েলি এবং দেশটির সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
জয়েন্ট লিস্টের অন্তর্ভুক্ত একটি দলের নেতা সামি আবু শাহাদেহ বলেন, ‘মানুষ যথেষ্ট বুদ্ধিমান, তারা কী ঘটছে তা বুঝতে পারে। দুটি বিকল্পের একটি গণহত্যার প্রস্তাব দিচ্ছে, অন্যটি বর্ণবাদের। এই দুটি বিকল্পের মধ্যে একটি খারাপ, অন্যটি আরও খারাপ।’
নির্বাচনের আগে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ান আবু শাহাদেহ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পরদিন প্রকাশিত একটি নিবন্ধের কারণে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি তাকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার অ্যাটর্নি জেনারেল দাবি করেছিলেন, নিবন্ধটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন করে। আবু শাহাদেহ নিবন্ধটি লেখার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও সশস্ত্র সংগ্রাম সমর্থনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সরকারে অংশ নেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইসরায়েলের মূলধারার দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে অনীহা দেখিয়ে আসছে। এসব দলকে ইসরায়েলের ইহুদি চরিত্রের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনাও রয়েছে।
২০২১ সালে নেতানিয়াহুর বিরোধীরা রা’আমকে নিয়ে একটি জোট সরকার গঠন করেছিল। ওই সরকার আরব অধ্যুষিত এলাকায় বিনিয়োগ এবং উচ্ছেদের ঝুঁকিতে থাকা অস্বীকৃত বেদুইন গ্রামগুলোর আইনি স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের একটি নিষেধাজ্ঞাসদৃশ অবস্থান ভেঙে রা’আমের সরকারে অন্তর্ভুক্তি দলটিকে নতুন রাজনৈতিক প্রভাব এনে দেয়।
তবে ইসরায়েলের রাজনীতি আরও ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ায় এবার আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করলে আইজেনকোটের পক্ষে সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক তামার হারমান। তার ভাষায়, ইসরায়েল ‘উদার গণতন্ত্র থেকে সরে এমন এক জাতিগত গণতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে, যেখানে একটি জাতিগোষ্ঠী অন্যদের তুলনায় সুবিধা পায়।’
রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের আসন আইজেনকোটকে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে সহায়তা করতে পারে। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সহায়তা করার যেকোনো পথেই তারা আগ্রহী বলে জানিয়েছে। এমনকি নেসেটে সরকার গঠনের ভোটে বিরত থেকে আইজেনকোটের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ সহজ করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে প্রকাশ্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের আগ্রহ না দেখিয়ে আইজেনকোট কিছু শর্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, দলগুলোকে ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং হামাসকে ধ্বংস করতে হবে—এমন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
আরব দল দুটির নেতারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিতে তারা আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এমন ঘোষণা গাজায় ইসরায়েলের ভয়াবহ সামরিক অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। ২০২১ সালে আব্বাস ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করেছিলেন। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের কয়েকজন নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, একটি রাষ্ট্র একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক এবং একটি ধর্মের অনুসারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া রাষ্ট্র হতে পারে কি না।
মঙ্গলবার আব্বাস বলেছেন, তিনি আত্মবিশ্বাসী যে রা’আম সরকারে যোগ দেবে। তবে আইজেনকোটের শর্ত মেনে নেওয়া হবে কি না, কিংবা দলটির নিজস্ব শর্ত কী—এ বিষয়ে এ সপ্তাহে করা প্রশ্নের জবাব দেয়নি রা’আম।
বুধবার আব্বাস চ্যানেল ১২-কে বলেন, শুধু পরিবর্তনপন্থী জোট নয়, নেতানিয়াহুর জোটের সদস্যরাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন বুধবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, আইজেনকোটের সঙ্গে এখনো তার কথা হয়নি, তবে আলোচনায় বসতে তিনি প্রস্তুত। তার জোটের দলগুলো এখনো নিজেদের শর্ত চূড়ান্ত করেনি। তবে আরব নাগরিকদের অধিকার ও সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার আশা করছেন তারা।
জাবারিন বলেন, ‘আমরা আমাদের সম্প্রদায়ের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, এই ফ্যাসিবাদী সরকারকে সরাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব।’
সময়ের আলো/জেডি