কিৎসা সেবা গ্রহণের জন্য বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনিরা ছায়ায় অপেক্ষা করছেন। ছবি : সংগৃহীত ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় গত আগস্ট থেকে অন্তত ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দফতর (ওসিএইচএ) এ তথ্য জানিয়েছে। বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে ৬ হাজার ১০০ জন অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬০০ জনের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে তাইজ প্রদেশ ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত ওসিএইচএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে থাকা ৬৫ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরগুলোতে জাতিসংঘের ভ্রাম্যমাণ দল ও ধাত্রীদের পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ত্রাণ সংস্থাগুলো প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার মানুষের কাছে খাদ্য, স্বাস্থ্যবিধি উপকরণ ও জরুরি নগদ সহায়তা পৌঁছে দিতে পেরেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ এই সহায়তা পেয়েছেন।
ইয়েমেনে সংঘাতের বিস্তার সৌদি আরবের সীমান্ত এলাকাতেও উত্তেজনা বাড়িয়েছে। শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদ অঞ্চলের আকাশে একটি ‘শত্রুভাবাপন্ন’ ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। দুই দিনের মধ্যে রিয়াদ অঞ্চলে এটি দ্বিতীয় ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনা।
এর আগে শুক্রবার সৌদি আরব জানিয়েছিল, মক্কা, মদিনা ও রিয়াদের কাছে কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের দিকে ছোড়া একটি হুতি ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়েছে। তবে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি ভূখণ্ডের দিকে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘জঘন্য মিথ্যাচার’ বলে অভিহিত করেছেন।
হুতিরা এর আগেও ইসলামের পবিত্র দুই নগরীকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে সৌদি রাজধানী, বিমানবন্দর ও তেল অবকাঠামোয় হামলার দায় তারা স্বীকার করেছে। গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বৈঠকের ফাঁকে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে সৌদি আরবে হুতিদের হামলার নিন্দা জানান তিনি।
এডেনেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার শুক্রবার অভিযোগ করেছে, হুতিরা অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মাশিক লক্ষ্য করে অন্তত তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এ ছাড়া এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে সরকার। আগের হুতি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মেরামত শেষে বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরটি আবার চালু হয়েছিল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও বিমানবন্দরটি একাধিকবার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ইয়েমেনের মন্ত্রিসভা এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছে। বিমানবন্দরে হামলাকে নাগরিকদের স্বার্থের ওপর সরাসরি আঘাত বলে উল্লেখ করে সরকার অভিযোগ করেছে, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলার মাধ্যমে হুতিরা বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত করতে চাইছে।
সরকারপন্থী বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নুজাইলি শুক্রবার দাবি করেন, কয়েক ঘণ্টার অভিযানে প্রায় ৩৩৬ হুতি যোদ্ধা ও কমান্ডারকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১১২টি যানবাহন, অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তাইজ, মারিব, আল-জাওফ ও আল-বায়দাসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে হুতিদের কমান্ড সেন্টার, সেনা সমাবেশ ও সরবরাহপথে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান ও রকেট লঞ্চারের মাধ্যমে হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
বাড়ছে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা
সরকারপন্থী সংবাদ সংস্থা সাবার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইজ প্রদেশে হুতিদের হামলায় এক নারী নিহত এবং শিশুসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। গোলাবর্ষণ ও গুলিতে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।
জাতিসংঘের হিসাবে, আগস্ট থেকে ইয়েমেনে ২৭০ জন বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অর্ধেকই শিশু। অন্যদিকে ইয়েমেন নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস জানিয়েছে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাইজ প্রদেশে তাদের মাঠপর্যায়ের দল হুতিদের হাজারো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৮৯ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৮ শিশু ও ২৭ নারী রয়েছেন। এ ছাড়া ২৩টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষকে অপহরণ বা গুমের তথ্যও জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংঘাতের কারণে বিভিন্ন সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের প্রায় ২০ লাখ মানুষের কাছে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও পানি পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধজুড়েই তাইজ শহরটি নিয়ে তীব্র লড়াই হয়েছে। চলতি মাসে শহরটির দক্ষিণে আল-তুরবাহসহ কয়েকটি এলাকা দখলে নেওয়ার পর তাইজকে ঘিরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে। এতে শহরটির মানবিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতি বাহিনী। এতে সরকার দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং দেশটিতে যুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৫ সালের মার্চে সরকারপন্থী বাহিনীর সমর্থনে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত আরও তীব্র হয়।
দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে হুতি প্রতিনিধিদল বহনকারী একটি উড়োজাহাজ অবতরণ করতে পারেনি। এরপর হুতিরা ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় বড় ধরনের অভিযান শুরু করে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়। হুতিদের কাছ থেকে দখল করা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের সরকার।
সময়ের আলো/জেডি