নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। ছবি : সময়ের আলোনিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অথচ এসব অটোরিকশার অধিকাংশ চালকদেরই নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। এসব অদক্ষ চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। পুলিশ বলছে, সড়কের শৃঙ্খলা আনতে লাইসেন্সবিহীন এসব চালকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালান হচ্ছে। তথ্য বলছে, লক্ষ্মীপুরে গত ৬ মাসে ১২টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এতে ৪ জন নিহতসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন।
চালকদের অভিযোগ, লাইসেন্স করতে তাদের বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মাহবুব রাব্বানী বলেন, সরকারি ফিয়ের বাইরে বাড়তি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। বিআরটিএ কার্যালয় দালালমুক্ত দাবি করে তিনি আরও বলেন, যে কেউ চাইলে ঘরে বসেও সরকার নির্ধারিত টাকায় ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন। লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কথা জানান বিএরটিএর এই কর্মকর্তা।
লক্ষ্মীপুর ট্রাফিক পুলিশের টিআই (প্রশাসন) কামরুল ইসলাম বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে অভিযান চালানো হচ্ছে। তা ছাড়া চালকদের লাইসেন্সের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে সচেতনতামূলক সভা এবং বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) হোসাইন মো. রায়হান কাজেমী বলেন, এটা সত্য যে অধিকাংশ থ্রি-হুইলার চালকেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ট্রাফিক পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া যানবাহন থেকে মাসিক ভিত্ততে টাকা নেওয়ার প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান জেলা পুলিশের এই কর্মকর্তা।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১৬ হাজারেরও বেশি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অথচ এসব অটোরিকশার বিপরীতে লাইসেন্স আছে মাত্র আড়াইশ থেকে ৩শ চালকের। অদক্ষ এসব চালক গাড়ি চালানর কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে মহাসড়ক। এতে প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে হতাহতের সংখ্যাও।
স্থানীয়রা বলছেন, ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন সিএনজি অটোরিকশা চালকদের কারণে সড়ক, মহাসড়ক যেন এখন মৃত্যুপুরী। ঝুঁকি জেনেও প্রয়োজনের তাগিদে তাদের উঠতে হচ্ছে সিএনজিচালিত এসব অটোরিকশায়। সড়কে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অদক্ষ চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানর জন্য প্রশাসনের নজরদারির অভাবকেই দূষছেন স্থানীয়রা।
লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, সড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশারই নেই ফিটনেস। আবার লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকরাই চালাচ্ছেন ওইসব অটোরিকশা। এতে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। সড়ক যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। তবুও টনক নড়ছে না প্রশাসনের। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ট্রাফিক পুলিশ ম্যানেজ না থাকলে কীভাবে চলছে অবৈধ এসব ফিটনেসবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা?
লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সালাউদ্দিন বাচ্চু বলেন, সিএনজি অটোরিকশা এমন একটি যান যেখানে আমাদের প্রতিনিয়ত উঠতে হয়। রাস্তায় যে হারে সিএনজি অটোরিকশা চলছে সেসবের ফিটনেস ও ড্রাইভারদের লাইসেন্স আছে কি না তা ট্রফিক বিভাগের দেখা উচিত। ট্রাফিক পুলিশ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে ফিটনেসবিহীন সিএনজি ও অদক্ষ চালকের সংখ্যা সড়ক থেকে অনেকটাই কমে যাবে। এতে কমবে দুর্ঘটনার সংখ্যাও।
এদিকে চালকরা বলছেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে বিআরটিএ অফিসে গেলে নানা জটিলতায় মধ্যে পড়তে হয় তাদের। চালকদের অভিযোগ, বিভিন্ন অজুহাতে সড়ক-মহাসড়কে চাঁদা দিয়ে চলতে হচ্ছে। এ ছাড়া টাকা দিলে লাগে না লাইসেন্স— এমন কথা জানালেন অনেকে। এতে লাইসেন্স করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করা কথা জানান তারা।
সিএনজিচালক আবদুর রহিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা লাইসেন্স করব কীভাবে? সরকারি ফি যেখানে ৩ হাজার ৬০০ টাকা সেখানে আমাদের কাছে চাওয়া হয় ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। বিআরটিএতে গেলে দালাল ছাড়া কোনো কাজও হয় না। আমরা যদি নিজ দায়িত্বে লাইসেন্স করতে যাই তা হলে ঘুরতে ঘুরতে হয়রানির আর শেষ থাকে না। আমরা লাইসেন্সটা করব কীভাবে?
জাবেদ নামের আরেক সিএনজিচালক বলেন, কাগজপত্র করে তো লাভ নেই। এখান থেকে ওখানে গেলে টাকা দেওয়া লাগে। তা হলে কাজগপত্র করে লাভ কি? টাকা না দিলে পুলিশের হয়রানি থেকে আমরা বাঁচতে পারি না। সড়কে টাকা দিয়েই আমাদের চলতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিএনজিচালক বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা রায়পুর উপজেলায়। সেখানে মাসিক ভিত্তিতে টাকা না দিলে গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না। প্রত্যেক সিএনজি অটোরিকশাকে মান্থলি দিয়ে চলতে হয়। আমরা লক্ষ্মীপুর থেকে সিএনজি নিয়ে রায়পুর গেলেই চাঁদা দিতে হয়, না দিলে কাজগপত্র সব ঠিক থাকলেও পুলিশ রং পার্কিংয়ের মামলা দেয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রায়পুরে সিএনজি থেকে মান্থলি আদায় করা এক প্রকার বৈধ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে দেখার যেন কেউ নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক সিএনজিচালক বলেন, রাতে পুলিশ ডিউটির নামে প্রতিনিয়ত আমাদের গাড়ি আটকে হয়রানি করে জেলা ও হাইওয়ে পুলিশ। টাকা দিলে আর ডিউটি করা লাগে না। না হলে পুলিশ উিউটির নামে গাড়ি আটকে রাখা হয়। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় আমাদের।
সময়ের আলো/আতা