২২ বছরে সর্বনিম্ন পাস

এম মামুন হোসেন

শিক্ষা

উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পরীক্ষার হলে বসেছিলে ১২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। কারও স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার,

2026-11-01T00:30:52+00:00
2026-11-01T00:56:25+00:00
 
  রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬,
১৭ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
শিক্ষা
এইচএসসির ফলাফল
২২ বছরে সর্বনিম্ন পাস
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৩০ এএম  আপডেট: ০১.১১.২০২৬ ১২:৫৬ এএম
এইচএসসির ফল প্রকাশের পর গতকাল ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেয়েকে মায়ের আদর। ছবি : আবদুল হালিম
উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পরীক্ষার হলে বসেছিলে ১২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। কারও স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার, কেউ চেয়েছিল ভালো ফল করে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে। পরীক্ষা শেষে অপেক্ষা ছিল ফলের। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে অনেকের জন্য হতাশা নিয়ে। 

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ফেল করেছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। শুধু পাসের হার নয়, কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। এক বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩২ হাজার ৯২। গত বছর পুনর্নিরীক্ষণের পর জিপিএ-৫ পেয়েছিলে ৭২ হাজার ১৭৬ জন। এবার পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

এবারের ফলে বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড বাদে প্রায় সব শিক্ষা বোর্ডেই এ বিষয়ে পাসের হার কম। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। বাধ্যতামূলক এ দুটি বিষয়ে দুর্বল ফল সামগ্রিকভাবে পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন বছরের মধ্যে পাসের হারে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ২০২৪ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছিল প্রায় ১৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। এবার তা আরও কমে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমেছে। শুধু পাসের হার নয়, কমেছে ফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার ২১৯। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৭ হাজারেরও বেশি।

এবারের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান, প্রশ্নপত্রের ধরন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নপদ্ধতি— সব বিষয়ই পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে ইংরেজির মতো বাধ্যতামূলক বিষয়ে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যদিও শুধু ফলের পরিসংখ্যান দিয়েই এর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিষয়ভিত্তিক ফল, প্রশ্ন কঠিন হওয়া, পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের ধরন পর্যালোচনা করেই প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা দরকার বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পাসের হারে বড় পতন : ২০০৫ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। এবারও বিএনপি ক্ষমতায়। ২০০৫ সাল থেকে এ বছর পর্যন্ত ২২ বছরের ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে বড় পতন ঘটেছিল গত বছর। ২০২৪ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে। ২০০৫ সালের পর গত বছরের পাসের হার ছিল সর্বনিম্ন। এবার সেই হার আরও কমে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমেছে।

এর আগে ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর ২০০৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো বছরই পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি। এ বছরগুলোতে পাসের হার কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। তবে বেশির ভাগ বছরেই তা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশেরও ওপরে ছিল। করোনা শুরুর বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে পরীক্ষা ছাড়াই ফল প্রকাশে সবাই পাস করেছিল। ফলে গত দুই বছরের ধারাবাহিক পতন এইচএসসি পরীক্ষার ফলের সাম্প্রতিক প্রবণতায় বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইংরেজি ও আইসিটিতে দুর্বলতা : এবারের ফলে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ছাড়া অন্য কোনো বোর্ডেই এ বিষয়ে পাসের হার ৭০ শতাংশে পৌঁছায়নি। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। এবার সাধারণ শিক্ষাবোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হারে ঢাকা বোর্ড শীর্ষে। অন্য বোর্ডগুলোতে ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৫৪ থেকে প্রায় ৬৬ শতাংশের মধ্যে। ইংরেজি বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সামগ্রিক ফলেও পড়েছে। তবে ইংরেজিতে ফল খারাপ হওয়ার কারণ শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতি কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রাপ্যতা, শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শেখানোর পরিবেশ এবং পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন— সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শুধু ইংরেজি বিষয়ে ফেল করেছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন। আর আইসিটিতে অকৃতকার্য হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। এই দুই বিষয়ের খারাপ ফল সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলা ও পদার্থবিজ্ঞানে তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করেছে শিক্ষার্থীরা। বাংলা বিষয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ১৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। পদার্থবিজ্ঞানে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৯৫ দশমিক ০১ শতাংশ। যুক্তিবিদ্যায় রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।

বিপরীতে ইংরেজি ও হিসাববিজ্ঞানে পাসের হার তুলনামূলকভাবে কম। ইংরেজিতে বরিশাল বোর্ডে সর্বনিম্ন ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং হিসাববিজ্ঞানে একই বোর্ডে ৫২ দশমিক ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। আইসিটিতে ঢাকা বোর্ডে সর্বোচ্চ পাসের হার ৭৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। বরিশালে এ হার সর্বনিম্ন ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ।


বিষয়ভিত্তিক ফলের এই পার্থক্য শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অসমতার বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশেষ করে ইংরেজিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া দীর্ঘদিনের ভাষাগত দুর্বলতা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি শিক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটাতে বিশেষ কোর্স কারিকুলাম হাতে নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক ফলে পাসের হার কমার পেছনে ইংরেজি ও আইসিটির খারাপ ফল বড় ভূমিকা রেখেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়া এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কঠোরতা এসেছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। কারণ এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা ধরনের ভুল ও অসংগতির অভিযোগ উঠেছিল। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি সরকার স্বীকারও করেছিল। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ ছাড়া রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়েও প্রশ্নপত্রে কিছু অসংগতির অভিযোগ করেছিল পরীক্ষার্থীরা।

শুধু প্রশ্ন প্রণয়ন বা মডারেশন ভুল নয়, এ বছর প্রশ্নপত্র বিতরণেও ঘটে বেশ কিছু গরমিল। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়েছে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্র, কোথাও আবার প্রথম পত্রের পরীক্ষার জায়গায় নেওয়া হয় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিস, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও তদন্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এবার বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। এ ছাড়া এবার মূল্যায়নপদ্ধতির পরিবর্তনও ফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এসব কারণের কোনটির প্রভাব কতটা, তা নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।

ফলের এই ধারাবাহিক অবনতি শুধু পরীক্ষায় পাস-ফেলের বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন এবং শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। পরীক্ষায় ভালো ফল করানোই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে তাদের দক্ষতা কতটা তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবারের ফলকে কেবল পাসের হার কমে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে না দেখে শিক্ষার গুণগত মান মূল্যায়নের একটি সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ছাত্রদের অর্ধেকের বেশি ফেল, ছাত্রীরা এগিয়ে : এবারের ফলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো— ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিপরীতে ছাত্রীদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ ছাত্রদের ৫২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৪৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ অকৃতকার্য হয়েছেন। অন্যদিকে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ছাত্ররা। এবার মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৩৬৩ জন এবং ছাত্রী ১৯ হাজার ৭২১ জন। ফলে পাসের হারে ছাত্রীরা এগিয়ে থাকলেও সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনে ছাত্ররা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।

এক বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ৩২ হাজার : এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া। গত বছর পুনর্নিরীক্ষণের পর ৭২ হাজার ১৭৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে। এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ কমেছে ৩২ হাজার ৯২। শতকরা হিসাবে কমেছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ। শুধু পাসের হার নয়, সর্বোচ্চ ফল অর্জনের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার চিত্র উঠে এসেছে। 

শিক্ষা বিশ্লেষকদের কাছে এ ফল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবিষয় আয়ত্ত করার সক্ষমতা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির সামগ্রিক পরিস্থিতিও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

বোর্ডভিত্তিক ফলে শীর্ষে ঢাকা, নিচে বরিশাল : ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিপরীতে সবচেয়ে কম পাসের হার বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ, কুমিল্লায় ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, যশোরে ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, বরিশালে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ, সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। 

নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জনের মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন। এ ক্ষেত্রে পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। গত বছর সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এ হার ছিল ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

এবার প্রথমবারের মতো ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রতিটি বোর্ডের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা হতো। অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার পরও বোর্ডভেদে ফলে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে।

২৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেননি : শুধু শিক্ষার্থীদের ফল নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে। গত বছর শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। এক বছরে এ সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। ২০২৪ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬৫টি। এবার শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩৯টি। 

গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫টি। শূন্য পাস করা ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে রয়েছে ১৮১টি। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ৫৫টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এ তালিকায়। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে দিনাজপুরে সর্বোচ্চ ৪৯টি, রাজশাহীতে ৩৯টি এবং ঢাকা বোর্ডে ২৬টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এ বছর মোট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৩৯০টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৩০২টি। শতভাগ পাস করা ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৬১টি, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ৫২টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৬টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলের এ চিত্র শিক্ষার সুযোগ ও মানের বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে না পারার পেছনে শিক্ষকসংকট, পাঠদানের পরিবেশ, নিয়মিত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির মতো বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এক বা দুই বিষয়ে ফেল করলেও মিলছে বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ : এবারের ফলে বড়সংখ্যক শিক্ষার্থী এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। তাদের জন্য বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী এক মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য হওয়া বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। সাধারণত এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে পরবর্তী বছরের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এতে একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণেও শিক্ষাজীবনে এক বছর পিছিয়ে পড়তে হয়। বাড়তি মানসিক চাপের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়।

এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার বিশেষ পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। তবে পরীক্ষা আয়োজনের সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সাত বা ১৫ দিনের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় নাও পেতে পারেন। আবার বেশি দেরি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই এক মাসের বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হবে না। বিশেষ করে পরীক্ষার সময়সূচির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সূচি সমন্বয়েরও চেষ্টা করা হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য এটি নতুন সুযোগ তৈরি করবে। তবে বিশেষ পরীক্ষার নিয়ম, সময়সূচি ও আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোর আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

শনিবার বেলা ১১টায় সচিবালয়ে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ফল প্রকাশের পরপরই শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অনলাইনে ফল জানতে শুরু করেন। ফল প্রকাশকে ঘিরে বিভিন্ন কলেজে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতি ছিল। কেউ মোবাইল ফোনে ফল দেখেছেন, কেউ শিক্ষকদের সহযোগিতা নিয়েছে। কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও আবেগের প্রকাশ দেখা গেছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেছে। কোথাও মায়ের সঙ্গে সন্তানের আনন্দঘন মুহূর্ত, কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তুলে সাফল্য উযাপনের দৃশ্য দেখা গেছে।

অভিভাবকদের কাছেও সন্তানের ফল ছিল বিশেষ মুহূর্ত। দীর্ঘদিনের পড়াশোনা, পরীক্ষা প্রস্তুতি ও অপেক্ষার পর ফল প্রকাশের দিনে কারও ঘরে আনন্দ, কারও ঘরে হতাশা। তবে ফল যা-ই হোক, শিক্ষার্থীদের সামনে পরবর্তী শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতি নেওয়ার প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   ২২ বছর  সর্বনিম্ন  পাস 


Advertisement
Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: