ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর প্রস্তুতির মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার সকালে দুই নেতার মধ্যে এই ফোনালাপ হয় বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। এর কয়েক ঘণ্টা পর ফ্লোরিডার পাম বিচে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানে আরও এক বা দুটি স্থাপনায় হামলা চালাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে একই সময়ে যুদ্ধ এড়াতে তেহরানের সঙ্গে আলোচনাও চলছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের এখনো এক বা দুটি স্থাপনার বিষয়টি সামলাতে হবে। তবে সেটি আমরা ১০ মিনিটের মধ্যেই করতে পারি।’ এ সময় তিনি ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের কথা উল্লেখ করেন। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের ধারণা, সেখানে পারমাণবিক উপাদান সংরক্ষণ করা হয়ে থাকতে পারে। চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এখনো ওই স্থাপনায় হামলা চালায়নি। ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘ভালোভাবেই এগোচ্ছে’ বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তবে দেশটিকে ‘খুব একটা নির্ভরযোগ্য নয়’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ এড়ানোর পথ খুঁজতে শনিবার কাতারের রাজধানী দোহায় কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানের আলোচকেরা। আলোচনার বিষয়ে অবহিত একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রটির ভাষ্য, শুক্রবার তেহরানে ইরানি ও কাতারি প্রতিনিধিদের মধ্যে ১২ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার দোহায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে এসব আলোচনা সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সূত্রটি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প ইরানে আবার হামলা শুরু করতে পারেন—এমন আশঙ্কা করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এর আগে শনিবার এমএস নাউয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ৪ নভেম্বর থেকেই ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে উপসাগরীয় মিত্রদের সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। তিনজন জ্যেষ্ঠ উপসাগরীয় কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলা স্বল্পস্থায়ী হলেও তীব্র হতে পারে। তবে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো।
গত ১ সেপ্টেম্বরের পর ইরানে আর হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন করে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সশস্ত্র বাহিনীকে যেকোনো হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পরে ইরানের সামরিক বাহিনীও নিজেদের প্রস্তুতি বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানায়।
এদিকে ইরানের প্রভাবশালী নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে তেহরানে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে এক ফতোয়ার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করেছিলেন। ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে আসছে।
তবে দেশটি এমন মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যার কোনো শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি পারমাণবিক স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশে বাধা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের জুনে যুদ্ধ শুরুর আগে ইসরায়েল দাবি করেছিল, ইরান সম্প্রতি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগোনোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
রেজায়ি বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দাবি মেনে না নিলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। ইরানের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিও বন্ধ থাকবে বলে জানান তিনি। গত সেপ্টেম্বর থেকে ইরান সাত দিনের একটি প্রস্তাব দিয়ে আসছে, যা এখন পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিতে হবে, জব্দ করা সম্পদ ছাড় করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সমর্থিত একটি রুট অনুমোদন করতে হবে। এরপর প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বলেও জানান রেজায়ি। তার মতে, চিঠি পাওয়ার পর ওয়াশিংটনের বক্তব্যের ধরন ‘সম্পূর্ণ বদলে গেছে’। তিনি বলেন, চিঠিটি পড়েছেন, তবে এখনো জবাব দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যে পরিবর্তনকে ‘ভালো লক্ষণ’ উল্লেখ করে রেজায়ি দাবি করেন, এতে প্রমাণ হয় ইরান তার বিজয় সুসংহত করেছে। চিঠির বিষয়বস্তু নিয়ে এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
কাতারের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চললেও ইরানি কর্মকর্তারা শনিবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করা এবং দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। এর আগে জুনে সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছিল ইরান। তবে চুক্তি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে।
সময়ের আলো/জেডি