প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা। ছবি : সময়ের আলোপাবনার আমিনপুরে নিরাপদ ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতে দুই দিনব্যাপী কৃষি মেলা ও প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা গৃহস্থালি সামগ্রী ও কৃষি উপকরণ নিয়ে উদ্বোধন করা হয়েছে কৃষি জাদুঘর।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে আমিনপুরের দয়ালনগর বাহারুন্নেছা পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে কৃষি সম্মাননা প্রদান করা হয়। দুই দিনব্যাপী আয়োজনের সমাপনী দিনে আমিনপুর-বাঁধেরহাট মহাসড়কের পাশে সংগৃহীত পুরোনো কৃষি উপকরণ ও গৃহস্থালি সামগ্রী দিয়ে সাজানো কৃষি জাদুঘরের উদ্বোধন করা হয়। বিকে ফাউন্ডেশন এ আয়োজন করে।
আয়োজকেরা জানান, নিরাপদ খাদ্যের সংকটের কারণে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তারা কৃষিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারসহ অনিরাপদ চাষাবাদকে চিহ্নিত করেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নিরাপদ ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতেই এ সম্মাননার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ সম্মাননার জন্য আবেদন করেন। তাদের মধ্য থেকে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের আটজন কৃষককে আর্থিক পুরস্কার ও স্মারক সম্মাননা দেওয়া হয়। বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক হিসেবে দুজনকে এক লাখ টাকা করে, প্রথম রানারআপ হিসেবে দুজনকে ৭৫ হাজার টাকা করে এবং দ্বিতীয় রানারআপ হিসেবে চারজনকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রত্যেককে সম্মাননা ক্রেস্ট দেওয়া হয়।
সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক হয়েছেন কমল কাপড়া ও সানোয়ার হোসেন। প্রথম রানারআপ হয়েছেন সুলতানা খাতুন ও চাষবাস। দ্বিতীয় রানারআপ হয়েছেন দেশি ফার্মের শাহাদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ আলী।
কৃষি খাতে বিভিন্ন অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার দেওয়ার প্রচলন থাকলেও অতিরিক্ত ফলনের প্রত্যাশা বাদ দিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করতে এ ধরনের সম্মাননা দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্মাননাপ্রাপ্ত টাঙ্গাইলের মধুপুরের কৃষক সানোয়ার হোসেন বলেন, ফসল আবাদের নামে মাটির ক্ষতি হয়, এমন কোনো উপকরণ ব্যবহার করা যাবেনা। এটি করা উচিতও নয়। মা ও মাটি কখনো কাউকে ঠকায় না। একে ভালোবাসলে প্রতিদান মিলবেই। আজকের সম্মাননা এর আরেকটি উদাহরণ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম। তিনি বলেন, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা না করতে পারলে আমরা নিরাপদ থাকতে পারব না। আধুনিক কৃষির নামে অতিরিক্ত সার কীটনাশক ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমাদের আরো সচেতন হওয়া উচিত। সুষম সার কীটনাশকের ব্যবহার ও প্রয়োজনীয় সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ নিয়ে গবেষণা বাড়ানোরও প্রয়োজন। সরকারও নিরাপদ কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ রক্ষার দিকে গুরুত্বারোপ করছেন। আজকের কৃষি সম্মাননার উদ্দেশ্যও এটি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিকে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এম. এ বাতেন খান। তিনি বলেন, আমাদের দেশের ৩৪ শতাংশ কৃষক ক্যান্সারে আক্রান্ত বলে জানা ছিলো। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রী জানিয়েছেন, এখন তা বেড়ে ৪০ শতাংশে উঠেছে। এভাবে আমরা অনেকেই নানা রোগে ভুগছি। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হওয়ায় এটির বিস্তার ঘটেছে। এক্ষেত্রে নিরাপদ বা প্রাকৃতিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে না তুললে এই সংকট ঘুচবে না। তাই সার কীটনাশকের অতি ব্যবহার না করে সনাতন পদ্ধতির নিরাপদ কৃষি আবাদকে উদ্বুদ্ধ করতে আমাদের এই আয়োজন।
কৃষকদের উৎসাহিত করার এ কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক রেল সচিব সেলিম রেজা, পল্লীকর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমির (নাটা) মহাপরিচালক সাইফুল আজম, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম জামাল উদ্দিন, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা মামুনুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার প্রকল্পের কনসালটেন্ট ড. মাহবুব আলম, দয়ালনগর বাহারুন্নেছা পাবলিক লাইব্রেরির প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এসএম আব্দুর রাজ্জাক এবং পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার প্রমুখ।
সময়ের আলো/জোই