তেকানি ইউনিয়ন পরিষদ। ছবি : সময়ের আলো সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার চরাঞ্চলে কুকুরে কামড়ানো গরু ক্রয়-বিক্রয় ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গরু মালিক, দালাল, এবং ক্রেতাকে গ্রাম্য সালিশ বৈঠকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করেছেন স্থানীয় কতিপয় মুরুব্বি। এছাড়াও জরিমানা আদায়ের লক্ষ্যে অভিযুক্তদের ভুট্টা গুদাম তালাবদ্ধ, এবং নানা সামাজিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার চরাঞ্চলের তেকানি ইউনিয়নের কিনারবের গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক বাদশা মিয়ার একটি গাভি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তারিখে পার্শ্ববর্তী জুমার খুকশিয়া গ্রামের গরু ব্যবসায়ী ফিরোজের কাছে ১৭ হাজার টাকা বিক্রি করেন।
একই দিন ব্যবসায়ী ফিরোজ অসুস্থ গাভি নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নের উত্তর তেকানি গ্রামের আলাউদ্দিন কসাইয়ের নিকট ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। কসাই গাভিকে জামালপুরে পাঠিয়ে দেয়। ইতোমধ্যে গাভিকে কুকুরে কামড়িয়েছে বলে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে স্থানীয়দের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এবং গ্রাম্য সালিশ বৈঠক আয়োজন করে মুরব্বিরা। একাধিক তারিখে এবং স্থানে অনুষ্ঠিত সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে গত ১৫ অক্টোবর তেকানির কাইউম মোড়ে অনুষ্ঠিত সালিসিতে গরু মালিকের ১ লক্ষ, ব্যবসায়ীর ৯ লক্ষ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়। পরের দিন ১৬ অক্টোবর একই বিষয়ে নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নের গুলমোড়ের গ্যারেজ বাজারে পুনরায় সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, ঐ বৈঠকে গরু ক্রেতা কসাই আলাউদ্দিনকে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা ধার্য করে। উভয় সালিসিতে শতাধিক জনগণ উপস্থিত ছিলেন।
গরু মালিক বৃদ্ধ কৃষক বাদশা মিয়ার পুত্রবধূ স্বপ্না (২৫) জানান, গাভিকে কুকুরে কামড়িয়েছে কিনা আমরা জানি না, গরুটি অসুস্থ মনে হচ্ছিল, তাই ফিরোজের কাছে ১৭ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। দু'দিন পর (১৫ অক্টোবর) এলাকার মুরুব্বিরা স্থানীয় কাইউম মোড়ে সালিশি ডাকে। সালিসিতে গরুকে কুকুরে কামড়িয়েছে বলে সাব্যস্ত করে ১ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করে। গোয়ালের দুটি গরু বিক্রি করে দুই কিস্তিতে জরিমানার টাকা স্থানীয় ফরিদ দোকানদারের কাছ জমা দেওয়া হয়েছে। সালিসিতে তেকানি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার, সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী খোশ মাহমুদ মাস্টারসহ তেকানি ইউনিয়নের কতিপয় মুরুব্বি উপস্থিত ছিলেন।
জুমার খুকশিয়া গ্ৰামের গরু ব্যবসায়ী ফিরোজকে বাড়িতে না পেলে তার বৃদ্ধ বাবা চাঁন জানান, ৯ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে, ১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, ছেলে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করতো সেটা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
গরু ক্রেতা ও কসাই আলাউদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১০ লাখ টাকা জরিমানার পাশাপাশি ৪/৫ শত মন ভুট্টা ভরা গুদাম লতিফ সরকার তার লোকজন নিয়ে তালাবদ্ধ করে রেখে গেছে, মাংসের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। জরিমানার ২৪ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
নাটুয়ারপাড়া সালিশি বৈঠকে আনোয়ার চেয়ারম্যান, খোশ মাহমুদ, ফরিদ সরকারসহ স্থানীয় মুরব্বিরা উপস্থিত ছিলেন।
সালিশ বৈঠকে উপস্থিত বিচারক তেকানি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাজহারুল আনোয়ার মোবাইল ফোনে জরিমানার কথা স্বীকার করে জানান, কুকুরে কামড়ানো গরুর চার মণ মাংস নাটুয়ারপাড়া এবং তেকানি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কয়েকশত মানুষ কিনে নিয়ে বাড়িতে রান্না করে খেয়েছ, কুকুরে কামড়ানো জেনে তারা সবাই ভ্যাকসিন নিয়েছে, উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কয়েকশত মানুষকে ভ্যাকসিনের মূল্য ফেরত দিতে জরিমানা ধার্য করা হয়। যাতে এ ধরনের গরু ক্রয় বিক্রয় ও জবাই থেকে বিরত থাকে।
ওপর বিচারক ও তেকানি ইউনিয়নের সাবেক শিক্ষক খোশ মাহমুদ জানান, জরিমানা ধার্য করা হয়েছে, কিন্তু আদায় হয়নি, এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। নাটুয়ার পাড়ার মুরুব্বি আব্দুল লতিফ সরকার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া উঠেছে।
কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহানাজ পারভীন জানান, বিষয়টি অবগত ছিলেন না, খোঁজ নিয়ে জানবেন তিনি। তবে বিষয়টি বিধিসম্মত নয় জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/জোই