বাবা-মায়ের সঙ্গে রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদার। ছবি : সংগৃহীতসংসারে অভাব-অনটন। বাবার স্থায়ী কোনো চাকরি নেই। শ্রবণপ্রতিবন্ধী বাবার সামান্য আয়েই চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে যমজ দুই বোন রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদার। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে দুজনই পেয়েছে জিপিএ-৫। তাদের লক্ষ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। পাশাপাশি শিক্ষক হয়ে পূরণ করতে চান বাবার স্বপ্ন।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের রামকার্জি গ্রামের এই দুই বোন রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের শিক্ষার্থী। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় তাদের কলেজ থেকে ১৪২ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে শুধু রহিমা ও রাবেয়া।
শুধু কলেজেই নয়, পুরো উপজেলায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তারাই একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জনকারী। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সাতটি কলেজ, তিনটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং চারটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান। দুই বোনের এমন সাফল্যে আনন্দিত পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
রহিমা ও রাবেয়ার বাবা মনির হোসেন সরদার রিজু এবং মা নাসিমা বেগম। তাদের তিন মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সংসারে স্থায়ী আয়ের কোনো উৎস নেই। সামান্য কৃষিজমি ও অনিয়মিত কৃষিশ্রমিকের কাজ করে একসময় সংসার চালাতেন মনির হোসেন। সীমিত আয়ে দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়েছে পরিবারটিকে। তবে পড়াশোনার প্রতি মেয়েদের আগ্রহে কখনো বাধা দেননি তারা।
মেয়েদের ফলাফলে আবেগাপ্লুত মা নাসিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘এত খুশি জীবনে আর কখনো হইনি। ওদের মুখে আনন্দের হাসি দেখেই বুকটা ভরে যায়। কিন্তু এর পেছনে কষ্টের লড়াই দীর্ঘদিনের।’
স্বামীর কর্মজীবনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী কুড়িগ্রাম সড়ক বিভাগে মাস্টাররোলে টাইপিস্টের চাকরি করতেন। ২০০২ সালে সেই চাকরি থেকে বাদ পড়েন। এরপর থেকে তিনি বেকার। কেউ তাকে কাজে নেয় না।’
সংসার চালানোর সংগ্রাম সম্পর্কে নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমাদের দুই বিঘা জমি। এক অংশে সুপারির বাগান, অন্য অংশে শাকসবজি চাষ করি। এ ছাড়া হাঁস-মুরগি পালন করি। স্বামী এসব দেখাশোনা করেন। এই আয় দিয়েই খাওয়া-পরা, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা।’
মেয়েদের পড়াশোনায় সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে মেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছি। প্রাইভেট শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন, আহসান হাবিব ও সোহেল স্যার বিনা পারিশ্রমিকে দুই বোনকে পড়িয়েছেন। কলেজের অধ্যক্ষ ভর্তি, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে নামমাত্র টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া তারা উপবৃত্তিও পেয়েছে। অনেকের সাহায্য-সহযোগিতা ছিল। সবার সহযোগিতা না পেলে হয়তো মেয়েদের পক্ষে এত ভালো ফল করা সম্ভব হতো না।’
মা হিসেবে তার প্রত্যাশা, পড়াশোনা শেষ করে দুই মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। চাকরি করবে। কারও ওপর নির্ভরশীল হবে না। অভাব যেন তাদের জীবনে আর ফিরে না আসে।
বাবা মনির হোসেন সরদারের স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান, দুই মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করুক। উচ্চশিক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষক হোক।
নিজেদের প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের কথা জানিয়ে রহিমা ও রাবেয়া বলেন, বাবার কষ্ট কিছুটা হলেও কমাতে এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতেই ভালো ফলের লক্ষ্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা। কলেজে যাতায়াত ও খাওয়াদাওয়ার সময় বাদে প্রায় পুরো সময়ই পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকতেন। ঘুমাতেনও খুব কম।
এখন তাদের স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। এটিকে বাবার স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন তারা। এরপর উচ্চশিক্ষা শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যেতে চান। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বিভিন্নজনের সহযোগিতায় রংপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করছেন। এ জন্য সবার দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছেন দুই বোন।
রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুহা. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজারহাট উপজেলার ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে এই যমজ দুই বোনই মানবিক শাখা থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তাদের এ অসাধারণ সাফল্যে আমরা আনন্দিত।’
তিনি আরও বলেন, নানা সংকটের মধ্যেও রহিমা ও রাবেয়ার এমন সাফল্য এলাকাবাসীকে গর্বিত করেছে। তাদের এই অর্জন এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় মনোযোগী হতে এবং স্বপ্ন পূরণে সাহস জোগাবে বলে আশা করেন তিনি।
সময়ের আলো/এনএন