ছবি : সংগৃহীত রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গ্রেফতার ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পুলিশের ভাষ্য, গ্রেফতার ব্যক্তিদের অন্তত তিনজনের মুঠোফোন থেকে নাশকতার ছবি ও ভিডিও একটি নির্দিষ্ট নম্বরে পাঠানো হয়েছিল। এসব ছবি-ভিডিও পাঠানোর পর তাদের প্রত্যেকের মুঠোফোনে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা করে আসে।
ডিবির দাবি, যে নম্বরে ছবি ও ভিডিও পাঠানো হয়েছিল, সেটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লার। ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, মিরপুরে পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদে আলিফ মোল্লার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেফতার কয়েকজনের মুঠোফোনে গাড়ি পোড়ানোর ভিডিওও পাওয়া গেছে। সেসব ছবি ও ভিডিও পাঠানোর পর তাদের কাছে টাকা আসার প্রমাণ মিলেছে।
রোববার মিরপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ২৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। তারা হলেন মাহমুদুর রহমান জুয়েল (৩৮), মো. অলিউল্লাহ অনিক (২০), মো. কামাল গাজী (৩২), আলিফ হোসেন ইমন (২৬), রমজান সরকার (১৮), মো. মাহিম মোল্লা (১৮), মো. জুবায়ের ইসলাম ওরফে জিসান (২২), মো. আরিফ আকন্দ (২৯), মোয়াজ্জেম শাহরিয়ার নিয়াজ (২৬), মো. আরিফ (১৮) ও মো. নাহিদ হাসান (১৮)।
সোমবার গ্রেফতার ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানো হয়। পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আদালতে তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গ্রেফতার ব্যক্তিদের স্বজনদেরও পাওয়া যায়নি। এ কারণে পুলিশের অভিযোগ ও দাবির বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত দুই দিন ধরে ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ চলছে। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকেরা মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
সোমবারও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভের চেষ্টা দেখা যায়। সকাল থেকে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ধাওয়া দেয় এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। সকাল থেকেই মিরপুর-১০ গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। গোলচত্বরে পুলিশের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যান ও জলকামানসহ বিভিন্ন যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়। পুলিশের বাধায় শ্রমিকেরা বড় ধরনের বিক্ষোভ করতে পারেননি। ফলে মিরপুর-১০ ও আশপাশের সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
এর আগে রোববার শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন—এমন মুখোশধারী ব্যক্তিরা আন্দোলনে ঢুকে সড়কে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছেন।
সোমবার সচিবালয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পতিত স্বৈরাচারের ফ্যাসিবাদের সমর্থিত কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে আগুন জ্বালিয়ে যারা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের পেছনে ইন্ধনদাতারা চিহ্নিত হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্রের দাবি, মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় নাশকতার জন্য লোকজন সংগঠিত করতে প্রায় ২৫টি হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপ ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গ্রুপে কোথায় পুলিশ অবস্থান করছে এবং কোথায় জড়ো হয়ে কী ধরনের ঘটনা ঘটাতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হতো।
মিরপুরে পুলিশের গাড়ি পোড়ানো ও ভাঙচুরের ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। সব কটি মামলার বাদী পুলিশ। সোমবার গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার। তিনি বলেন, প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাতনামা এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
সোমবার মিরপুরের পরিস্থিতি নিয়ে মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের গোলচত্বর এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন-উত্তর) মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, রোববারের ঘটনায় শুধু শ্রমিকেরা জড়িত ছিলেন, বিষয়টি এমন নয়। তদন্তে শ্রমিকদের পাশাপাশি অন্য অপরাধীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জেডি