রাণীনগর সরকারি হাসপাতালে রসিদবিহীন অর্থ আদায়ের অভিযোগ

নওগাঁ প্রতিনিধি

সারাদেশ

সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও মিলছে না কোনো রসিদ। এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবায়

2026-11-04T17:25:47+00:00
2026-11-04T17:42:51+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
রাণীনগর সরকারি হাসপাতালে রসিদবিহীন অর্থ আদায়ের অভিযোগ
নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৫:২৫ পিএম  আপডেট: ০৪.১১.২০২৬ ৫:৪২ পিএম
রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ছবি : সময়ের আলো
সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও মিলছে না কোনো রসিদ। এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবায় রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও সেই টাকার বিপরীতে দেওয়া হচ্ছে না সরকারি রসিদ। ফলে রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন? এমনই রসিদবিহীন অর্থ আদায় ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে কর্মরত সবুজ নামে এক ব্যক্তি প্রতিটি এক্স-রে করার জন্য রোগীদের কাছ থেকে ২১০ টাকা করে নিচ্ছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেওয়া হচ্ছে না কোনো রসিদ।

অন্যদিকে, হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. কে এইচ এম ইফতেখারুল আলম খান নিজেই আলট্রাসনোগ্রাফি করেন এবং রোগীদের কাছ থেকে ২২০ টাকা করে নেওয়া হলেও সেখানেও রসিদ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা।

সরেজমিনে গিয়ে একাধিক রোগী ও তাদের স্বজনের সঙ্গে কথা বলে রসিদ ছাড়াই টাকা আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০টি এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। তবে এক্স-রের প্রকৃত সংখ্যা, রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া টাকার হিসাবের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দিঘীরপাড় এলাকার মিজান নামে যুবক তার ৭০ বছর বয়সী দাদিকে বুকের এক্স-রে করাতে নিয়ে আসেন। এজন্য তাকে দিতে হয় ২০০ টাকা। কিন্তু টাকা নেওয়া হলেও দেওয়া হয়নি কোনো রসিদ।

তিনি জানান, তাকে বলা হয়েছিল পরে রসিদ দেওয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও রসিদ না পেয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, দুইশ টাকা নিয়েছে, রসিদ তো অবশ্যই দেওয়া উচিত ছিল। রসিদ না দিলে এই টাকা কোথায় যাচ্ছে, তার কোনো হিসাব থাকবে না।

একইভাবে পায়ের এক্স-রে করাতে আসা ৬০ বছর বয়সী নিজাম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকেও ২০০ টাকা নেওয়া হয়, কিন্তু তাকেও দেওয়া হয়নি রসিদ। আজিমদ্দিন নামের আরেক ব্যক্তির কাছ থেকেও এক্স-রের জন্য ২০০ টাকা নেওয়া হলেও কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি।

হরিশপুর এলাকার ৬৫ বছর বয়সী রিজিয়া পড়ে গিয়ে হাতে ব্যথা পাওয়ার পর এক্স-রে করাতে আসেন। তার কাছ থেকেও ২১০ টাকা নেওয়া হয়। একইভাবে ৫৫ বছর বয়সী পারুলের হাতের এক্স-রে করাতেও নেওয়া হয় ২১০ টাকা। কিন্তু তাদেরও রসিদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

শুধু এক্স-রে নয়, আলট্রাসনোগ্রাফি বিভাগেও একই চিত্র দেখা গেছে। খবির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে ২২০ টাকা দেন। কিন্তু তাকে কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। একইভাবে ফোরদৌস ও সুমি নামের দুই সেবাগ্রহীতার কাছ থেকেও ২২০ টাকা করে নেওয়া হলেও তাদের হাতে পৌঁছায়নি কোনো রসিদ। এমনকি এক গণমাধ্যমকর্মীর কাছ থেকেও আলট্রাসনোগ্রাফির জন্য ২২০ টাকা নেওয়া হলেও তাকে রসিদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আলট্রাসনোগ্রাফি কক্ষে দায়িত্বে থাকা এক নারী কর্মী এসব টাকা গ্রহণ করছিলেন বলে জানান তারা।

এদিকে আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় রোগীদের। বেলা ১২টার দিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসপাতালে এসে জানান, দিনে ১০টির বেশি আলট্রাসনোগ্রাফি করা হবে না। এতে বিপাকে পড়েন অপেক্ষমাণ সেবাগ্রহীতারা।

রসিদ ছাড়া টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নিজেকে এক্স-রে টেকনিশিয়ান পরিচয় দেওয়া সবুজ বলেন, তিনি প্রায় ৬ বছর ধরে এখানে মাস্টাররোলে কাজ করছেন। তার দাবি, এখানে রসিদ কেটেই এক্স-রে করার নিয়ম রয়েছে। তবে জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়াই এক্স-রে করা হয় এবং পরে রসিদ কাটা হয়। প্রতিদিন সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাতটি এক্স-রে করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন।

সবুজ আরও বলেন, এখানে ২১০ টাকা নেওয়া হয়। এক্স-রে ফি ২০০ টাকা এবং একটি বড়ো খামের জন্য আমি ১০ টাকা করে নিয়ে থাকি। এক্স-রের যাবতীয় তথ্য কম্পিউটারে পোস্টিং দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে রসিদ কাটা হয়।

একই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, তবে কোন কারণে কম্পিউটার একবার বন্ধ হয়ে গেলে আর কোনো ডকুমেন্টস থাকে না, সব ডিলিট হয়ে যায়। তার এমন বক্তব্যে এক্স-রের প্রকৃত সংখ্যা, রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ এবং তার হিসাব সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ?

অভিযোগের বিষয়ে রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কে এইচ এম ইফতেখারুল আলম খান বলেন, সপ্তাহে তিন দিন আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। আলট্রাসনোগ্রাফি আমি নিজেই করি। একটা মেয়ে আমাকে সহায়তা করে লোকবল সংকটের কারণে রসিদ দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে আমি খাতায় নোট করে রাখি, মাস শেষে যাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়, তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। আপনারা যদি এটাকে ভুল মনে করেন, তাহলে আমি আলট্রাসনোগ্রাফি করা বন্ধ করে দেব। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- এক্স-রেও আমি করি, তবে সেখানে রসিদের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করা হয়।

নওগাঁর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মুনির আলী আকন্দ বলেন, রসিদের বাইরে কোনো ধরনের লেনদেনের নিয়ম নেই। রসিদ কেটেই সেবা নিতে হবে। রোগীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়াই এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।

স্থানীয় ও সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বশীল কয়েকজনকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে রসিদ ছাড়াই রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। আর এসব অর্থ যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে কি না, তার স্বচ্ছ হিসাবও দৃশ্যমান নয়। রোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হবে অথচ তার বিপরীতে সরকারি রসিদ দেওয়া হবে না। এমন ব্যবস্থা কোনোভাবেই স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির নামে আদায় করা অর্থের প্রকৃত হিসাব, প্রতিদিনের পরীক্ষার সংখ্যা, রসিদ বই, কম্পিউটার ডেটা, ক্যাশবুক এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আউটসোর্সিং কর্মী, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অর্থ জমার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা জরুরি বলে দাবি করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, মাস শেষে টাকা জমা দেওয়ার দাবি করা হলেও প্রতিটি সেবার বিপরীতে তাৎক্ষণিক সরকারি রসিদ দেওয়া হচ্ছে না কেন? আদায় করা অর্থের সঙ্গে রোগীর সংখ্যা, পরীক্ষার সংখ্যা এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের হিসাব মিলিয়ে দেখার সুযোগ কতটুকু রয়েছে সেটিও প্রশ্ন থেকে যায়।

সময়ের আলো/এনএন
  বিষয়:   রাণীনগর সরকারি হাসপাতাল  রসিদবিহীন অর্থ আদায়  অভিযোগ  নওগাঁ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: