বিরাট কোহলি । ছবি : সংগৃহীতঅন্য সব দিনের মতো একটা সাধারণ দিন, তবে সেই দিনটি এখনও পিঠে বয়ে বেড়ান বিরাট কোহলি। ১৮ নম্বর জার্সির ইতিহাসের শুরু সেখানেই। যে দিনটি তাকে পরিণত করে তোলে, বাস্তবতা বুঝতে শেখায়!
২০০৬ সালের ডিসেম্বরে কর্ণাটকের বিপক্ষে ফিরোজ শাহ কোটলায় দিল্লির হয়ে রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ খেলছিলেন ১৮ বছর বয়সী বিরাট কোহলি। ১০৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে তখন ফলোঅন এড়ানোর লড়াইয়ে দিল্লি। সেদিন ৪০ রানে অপরাজিত ছিলেন বিরাট, হয়তো পরের দিন স্বপ্ন দেখছিলেন, দলকে বড় সংগ্রহ এনে দেবেন, কিংবা ম্যাচ বাঁচিয়ে রাখবেন!
মাথায় যখন দল নিয়ে ভাবনা, তখন রাত ৩টায় ঘটে যায় তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। হুট করে শরীর খারাপ হতে শুরু করে তার বাবা প্রেম কোহলির। দ্রুত ব্যবস্থা করা হয় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু বাবার মৃত্যু ঘটে কোহলির হাতের ওপরেই! মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে!
বাবার মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়ে হয়তো সব ভুলে যাওয়ার কথা ছিল কোহলির। কিন্তু যা ঘটল, সেটা হয়তো একটু অবিশ্বাস্যই! বাবার মৃত্যুর পর কোহলি ফোন করেছিলেন শৈশবের কোচ রাজকুমার শর্মাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘আমার বাবা আর নেই!’
মৃত্যু বেদনাদায়ক হলেও, এটা তো আসবেই। তবে এরপর যা করলেন কোহলি, সেটা শুনেই ধাক্কা লাগে রাজকুমারের। মাত্র ১৮ বছর বয়সেও কেউ এমনটা ভাবতে পারে? বাবার মরদেহ ঘরে রেখে কোহলি জানতে চাইলেন, তিনি কি কাল মাঠে নামবেন? জবাবে শর্মা তাকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, চরিত্র প্রমাণ করার এটাই সময়।
পরদিন সকালে বাড়িতে তখনও বাবার মরদেহ। কিন্তু সবকিছু পেছনে ফেলে মাঠে হাজির হন কোহলি। ব্যাট হাতে নামার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২৮১ মিনিট ক্রিজে থেকে ২৩৮ বল মোকাবিলা করেন। আগের দিনের ৪০ রানের সঙ্গে আরও ৫০ রান যোগ করে শেষ পর্যন্ত ৯০ রানে আউট হন তিনি। সেদিন তার কল্যাণেই বেঁচে যায় দল, সক্ষম হয় ম্যাচটি ড্র করতে। ১৮ তারিখ বাবা মারা যান বলে এরপর নিজের জার্সি নম্বর বেছে নেন ১৮।
প্রবাদে আছে, মর্নিং শোজ দ্য ডে। হয়তো শুরুটা হয় সেখান থেকেই। এরপর যে কতবার ভারত ও রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে একা হাতে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছেন, তার কোন হিসাব নেই। বাবার মৃত্যু তাকে একজন কিশোর থেকে হুট করেই দায়িত্ববান পুরুষে পরিণত করে।
বিশেষ একটি কারণও অবশ্য ছিল এমন হওয়ার। বাবার স্বপ্ন ছিল ভারতের হয়ে খেলতে হবে কোহলিকে। আর সেই স্বপ্ন পূরণ করবেন বলেই আরও বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন বিরাট। যে ছেলে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চায়, হয়তো তর স্বপ্নের অর্ধেক পূরণ সেখানেই হয়ে যায়। বাকিটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্জন করেন বিরাট।
২০০৮ সালে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক করে কোহলিকে পাঠানো হয় বিশ্বকাপ খেলতে। টুর্নামেন্ট শেষে দেশে ফিরে আসেন ট্রফি হাতে। এরপর আর কখনও পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কোহলিকে।
সেবছরই সুযোগ পান জাতীয় দলে, তবে ব্যর্থ হন বিরাট। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে ২২ বলে ১২ রান করে বিদায় নেন তিনি। বাদ পড়েন, এরপর দলে আবার ফিরেও আসেন। সেই কোহলিই এখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে রেকর্ড সর্বোচ্চ দশটি শতক হাঁকিয়েছেন। যা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই ফরম্যাটে সর্বোচ্চ!
আসলে এটাই কোহলির ক্যারিয়ারের সারসংক্ষেপ! বছর ঘুরেছে, তিন ফরম্যাটেই রাজত্ব করেছেন। কে সেরা ক্রিকেটার, সেই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকলেও, বিরাট কোহলিকে তিন ফরম্যাটের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মেনে নিতে কারওই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
২৮ হাজারের বেশি রান করেছেন, ৮৬টি শতক করেছেন, একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে সব ফরম্যাটে ৪৫ -এর বেশি গড় বজায় রেখেছেন। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছেন, তার ঝুলিতে রয়েছে আরও দুটি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা। রান করাকে এতটাই সহজ বানিয়েছেন, মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ রান করার কাজ। তাই তো ভালোবেসে সবাই তাকে ‘বিরাট কোহলি দ্য রান মেশিন’ বলেই ডাকে। আর এটা তো অর্জন করেই নিয়েছেন বিরাট। দেখতে দেখতে ৩৮ বছর পূর্ণ হয়ে গেল তার। শুভ জন্মদিন বিরাট, দ্য চেস মাস্টার!
সময়ের আলো/এসকে