বিজয় দিবসের দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। ছবি : সংগৃহীত আসছে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। কিন্তু টার্মিনাল এলাকায় এখনও শুরু হয়নি মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্পের কার্যক্রম। একবার দরপত্র আহ্বান করলেও প্যাকেজ ও শর্তের জটিলতার কারণে দরপত্রে অংশ নেয়নি একটি প্রতিষ্ঠানও। তাই শুরুতে মুখ থুবড়ে পড়েছে ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে টেলিটকের মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্প’। তাই ১৬ ডিসেম্বরের আগে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে ধীরগতি থাকলে পদোন্নতি পেয়েছেন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি)। গত ২৮ অক্টোবর প্রকল্পের পরিচালক ও টেলিযোগাযোগ অধিদফতরে জিএম (ইঞ্জি.) মো. আনোয়ার হোসেনকে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নবনির্মিত থার্ড টার্মিনালের ভেতরে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চলতি বছরের জুন মাসে ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল— টার্মিনালের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা। যাত্রীদের উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা। দুর্বল সিগন্যাল, কল ড্রপ ও ধীরগতির ইন্টারনেটের সমস্যা দূর করা। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, এয়ারলাইনস, ইমিগ্রেশন ও অন্যান্য সংস্থার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং ভবিষ্যতে ৫জি প্রযুক্তি ব্যবহারের উপযোগী নেটওয়ার্ক অবকাঠামো তৈরি করা। সরকারি অর্থায়নে শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৭৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা করার জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ কাজ শুরুর আগেই প্রায় ২৭ কোটি (২৬.৭৩) টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড।
এদিকে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হলেও এখনও প্রকল্পের কোনো কাজই শুরু করতে পারেনি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। গত ২২ জুলাই মূল নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য দরপত্র প্রকাশ করে টেলিটক। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মূল সরঞ্জাম কেনার দরপত্র জমা ও খোলা হয়। এরপর গত ২০ সেপ্টেম্বর মূল প্যাকেজের দরপত্রে নির্ধারিত সম্ভাব্য কাজ শুরু হয়ে ১৫ নভেম্বর দরপত্রে নির্ধারিত সম্ভাব্য সমাপ্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু মূল সরঞ্জাম কেনার জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলেও তাতে অংশ নেয়নি একজন দরদাতাও। ফলে পুনরায় আবারও দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা করছেন প্রকল্প পরিচালক।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন হলে ফের দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছে প্রকল্পের পরিচালক ও টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন। এখনও কাজ শুরু না হলেও আগামী এক মাসের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার আশা ব্যক্ত করে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ফিজিক্যাললি মাঠে কাজ শুরু না হলেও আমরা প্রিপারেশন নিয়ে রেখেছি। এখন সার্ভেসহ অন্যান্য কাজ চলছে।
তিনি বলেন, শুরুতে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। পরবর্তীতে কিছু কারণে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বর্ধিত বরাদ্দ চেয়ে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনও অনুমোদন হয়নি। বাজেট অনুমোদন না হলে তো আর আমরা কাজ করতে পারি না। তিনি আরও বলেন, আমরা প্রথমবার যে দরপত্র আহ্বান করেছিলাম সেখানে আমরা কোনো বিডার (দরদাতা) পাইনি। যে কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে।
দরপত্রে কেন কোনো দরদাতা অংশ নিল না বা দরপত্র আহ্বানে কোনো ত্রুটি ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের মেজর কোনো ভুল নেই বলে মনে হয়। তারপরও কেন অংশ নিল না এটা বলতে পারছি না। আবার কবে দরপত্র আহ্বান করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা এখনও বলতে পারছি না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেলিটকের এক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, সব কাজ এক প্যাকেজের আওতায় আনার কারণে ও দরপত্রে এমন সব অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়া হয়েছিল যা কোনো একক ঠিকাদারের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তাই কোনো দরদাতা তখন দরপত্রে অংশ নেয়নি। কারণ সবার তো আর সব কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকে না।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন এলাকা, চেক-ইন কাউন্টার, ভিআইপি লাউঞ্জ, এক্সপোর্ট কার্গো টার্মিনাল, ইমপোর্ট কার্গো টার্মিনাল ও টার্মিনালের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ এলাকায় ভালো নেটওয়ার্ক কাভারেজ পাওয়া যাবে। ফলে যাত্রীদের পাশাপাশি বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থা, এয়ারলাইনস ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের সুবিধাও বহুগুণে বেড়ে যাবে। কারণ প্রকল্পের আওতায় প্রধানত তিন ধরনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো স্থাপন করার কথা রয়েছে। প্রথমত অ্যাক্টিভ ডিস্ট্রিবিউটেড অ্যান্টেনা সিস্টেম (‘অ্যাকটিভ ডিএএস’)। বড় ভবনের ভেতরে কংক্রিট, স্টিল ও কাচের কারণে মোবাইল সিগন্যাল দুর্বল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ‘অ্যাকটিভ ডিএএস’ সেই সমস্যা কমাতে সাহায্য করবে এবং টার্মিনালের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল পৌঁছে দিতে এই প্রযুক্তি ভালো কাজ করবে। দ্বিতীয়ত ‘স্মল সেল ও মাইক্রো বিটিএস স্থাপন’। টার্মিনালের বিভিন্ন স্থানে মোট ৭০০টি ‘স্মল সেল’ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো নেটওয়ার্কের সক্ষমতা ও কাভারেজ বাড়িয়ে দেবে। তৃতীয়ত ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক স্থাপন। এর মাধ্যমে প্রকল্পের আওতায় ৬৩৫টি ওয়াই-ফাই ইউনিট বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে টার্মিনালের বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া মূল নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম, ট্রান্সমিশন সিস্টেম, প্রয়োজনীয় ফাইবার ও অন্যান্য সংযোগব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
উল্লেখ্য বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের যৌথ অর্থায়নে ২০১৭ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় তৎকালীন সরকার। ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। এরপর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থার্ড টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধন করা হয়। তখন বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছিল, ২০২৪ সালের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্ভব হয়নি। এবার ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি আগামী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে থার্ড টার্মিনালের পুরো কার্যক্রম চালুর কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
তিনি জানান, ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলেও শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হতে আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগবে। এ সময়ের মধ্যে টার্মিনালের সব কার্যক্রম ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে