সময় বাঁচানোর মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল, চার বছরে ঝরেছে ১৬৯ প্রাণ

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি

সারাদেশ

পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। কমেছে যাতায়াতের সময়, বেড়েছে যানবাহনের চলাচল। প্রতিদিন হাজারো মানুষ

2026-11-07T10:32:23+00:00
2026-11-07T10:32:23+00:00
 
  শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬,
২৩ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
সময় বাঁচানোর মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল, চার বছরে ঝরেছে ১৬৯ প্রাণ
শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৩২ এএম 
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে। ছবি : সময়ের আলো
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। কমেছে যাতায়াতের সময়, বেড়েছে যানবাহনের চলাচল। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই পথে যাতায়াত করছেন। কিন্তু যোগাযোগের এই গতির আড়ালে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার উদ্বেগ। একের পর এক দুর্ঘটনায় ঝরে যাচ্ছে প্রাণ, আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকে। স্বজন হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ছে পরিবার। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার এই মহাসড়ক যেন অনেকের কাছে এখন আতঙ্কের নাম।

পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্ত থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানও সেই উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরছে। হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় চার বছর তিন মাসে এই মহাসড়কে ২১৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬৯ জন। আহত হয়েছেন ১১২ জন। দুর্ঘটনাগুলোতে ৮৪টি মামলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২৮ জন পুরুষ, ৩৩ জন নারী ও ৮ জন শিশু।

স্থানীয় বাসিন্দা, চালক ও নিয়মিত যাতায়াতকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী ওঠানামা এবং অসতর্কভাবে সড়ক পারাপার দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশি নজরদারির ঘাটতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

২০২৩ সালের ১৯ মার্চ শিবচরের কুতুবপুর এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা এখনো স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক তৈরি করে। কুতুবপুরের বাসিন্দা সাকিব হাসান বলেন, এই সড়কে যানবাহন বেপরোয়াভাবে চলে। ২০২৩ সালে এখানেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ২০ জনের মতো মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। বর্তমানে যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর পেছনেও বেপরোয়া গতির ভূমিকা রয়েছে। আগে স্পিড গান নিয়ে হাইওয়ে পুলিশ দায়িত্ব পালন করতেন। অতিরিক্ত গতি ধরা পড়লে মামলা দেওয়া হতো। এখন আগের মতো স্পিড গান নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না। প্রশাসন নিয়মিত স্পিড গান দিয়ে গতি নিয়ন্ত্রণ করলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ওঠানামার বিষয়টিও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে পাঁচ্চর গোলচত্বর এলাকায় যাত্রী ওঠানোর জন্য যানবাহন থামানোর প্রবণতা রয়েছে। অথচ যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য এক্সপ্রেসওয়ের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে যাত্রীছাউনি।

মহাসড়কে নির্ধারিত স্থান ছাড়া বাস থামানোর বিষয়ে বাসচালক রমজান মোল্লাহ বলেন, ওপরে যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকে, তাই গাড়ি থামাতে হয়। যাত্রীছাউনি কিছুটা পেছনে হলেও যাত্রীরা এখানে দাঁড়িয়ে থাকে। এ কারণে আমাদেরও এখানে থামতে হয়।

অন্যদিকে, পরিবহনচালক এমদাদুল ইসলাম বলেন, তিনি সড়ক আইন মেনে নির্ধারিত গতিতে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করেন। তার ভাষ্য, অনেক সময় মোটরসাইকেল চালকদের বেপরোয়া চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং পথচারীদের হঠাৎ রাস্তা পারাপারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।

নিয়মিত চলাচলকারী মোটরসাইকেল চালক মেহেদী হাসান বলেন, আমি নিয়মিত এই সড়ক দিয়ে চলাচল করি। আড়িয়াল খাঁ সেতু পার হওয়ার পর পরিবহণগুলো একে অপরকে ওভারটেক করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে আমরা মোটরসাইকেল চালকেরা আতঙ্কে থাকি। পাঁচ্চরে কে আগে গিয়ে যাত্রী তুলবে, তা নিয়েই যেন তাদের প্রতিযোগিতা। অনেক সময় এমনভাবে ওভারটেক করে যে আমাদের মোটরসাইকেল নিয়ে সড়কের সাদা দাগের নিচে নেমে যেতে হয়। এতে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

পাঁচ্চর এলাকায় যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য নির্মিত যাত্রী ছাউনির বাস্তব চিত্রও হতাশাজনক। সরেজমিনে দেখা যায়, যাত্রীছাউনির ভেতরে যাত্রী ওঠানামার নির্ধারিত জায়গায় একটি মালবাহী ট্রাক পার্ক করে রাখা হয়েছে। যাত্রীদের বসার স্থানে পড়ে রয়েছে পুরোনো পোশাক, মাটির চুলা ও লাকড়ি। ফলে যাত্রীদের সুবিধার জন্য নির্মিত স্থাপনাটি কার্যত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে।

ঢাকাগামী যাত্রী মঈন খান বলেন, পরিবহণগুলো যদি নির্ধারিত যাত্রীছাউনিতে থামত, তাহলে পাঁচ্চর গোলচত্বরের পাশে এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি থামানোর প্রয়োজন হতো না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমত। এখন রেলিং টপকে এক্সপ্রেসওয়েতে গিয়ে গাড়িতে ওঠা খুবই বিপজ্জনক। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশাসনের কাছে দাবি, দ্রুত যাত্রীছাউনিটি চালুর উপযোগী করে সেখানে যানবাহন থামানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

মহাসড়কে অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড গান ব্যবহারের বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ থাকলেও হাইওয়ে পুলিশ বলছে, এ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; সীমিত পরিসরে চলছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

হাইওয়ে পুলিশের মাদারীপুর রিজিয়নের পুলিশ সুপার মমতাজুল এহসান আহমেদ হুমায়ুন মোবাইল ফোনে বলেন, এক্সপ্রেসওয়েতে আমাদের এআই প্রকল্প রয়েছে। এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। প্রকল্পটি চালু হলে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম থেকে যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। স্পিড গান ব্যবহারের কার্যক্রম একেবারে বন্ধ নেই, সীমিত পর্যায়ে চলছে। যাতে মানুষের হয়রানি না হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এক্সপ্রেসওয়ের কয়েকটি স্থানে মানুষ পায়ে হেঁটে রাস্তা পারাপারের চেষ্টা করেন। বিশেষ করে পাঁচ্চর এলাকায় এ প্রবণতা রয়েছে। সেখানে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। ফায়ার সার্ভিসের শিবচর স্টেশন মাস্টার তপন কুমার ঘোষ বলেন, হাইওয়ের দুর্ঘটনা মোকাবিলায় আমাদের ভাঙ্গা ইউনিট কাজ করে। শিবচর থেকে আমরা সীমিত পরিসরে কাজ করি। তবে ভাঙ্গা ইউনিটে জনবল বেশি এবং আধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে।


তিনি আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা বা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের স্টেশনে সর্বাধুনিক প্রস্তুতি রয়েছে। দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ি বা বাস থেকে হতাহতদের উদ্ধারে বিশেষায়িত রেসকিউ ভেহিকল ও পিকআপ রয়েছে। গাড়ির ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারে হাইড্রোলিক কাটার, স্প্রেডার, রাম ও মেকানিক্যাল জ্যাক ব্যবহার করে গাড়ির বডি বা দরজা কেটে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা হয়। আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া এবং নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য জীবনরক্ষাকারী অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত থাকে।

তবে উদ্ধার প্রস্তুতি থাকলেও দুর্ঘটনার পর পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা ইমন আহমেদ বলেন, দুর্ঘটনার পর প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এই ভাঙ্গা হাইওয়েতে দুর্ঘটনা ঘটলে আহত ব্যক্তিদের শিবচর অথবা ঢাকায় নিতে হয়। এতে অনেক সময় লেগে যায়। আড়িয়াল খাঁ সেতুর পাশে নির্মিত ট্রমা সেন্টারটি চালু করা গেলে অনেক আহত ব্যক্তির প্রাণ বাঁচানো সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস। সরকারের কাছে দাবি, দ্রুত এটি চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।

এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার বলেন, আড়িয়াল খাঁর পাশে নির্মিত ট্রমা সেন্টারটি চালু হলে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা সহজেই সেখানে চিকিৎসা নিতে পারবেন। এ ছাড়া বরিশাল-ভাঙ্গা সড়কেও আরেকটি ট্রমা সেন্টার হলে ভালো হয়।

পদ্মা সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ে দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা টেকসই করতে হলে সড়ক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত স্পিড গান ব্যবহার, দৃশ্যমান পুলিশি নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধ, নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা, যাত্রীছাউনি সচল রাখা, নিরাপদ পারাপার এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

জাজিরা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২১৮টি দুর্ঘটনায় ১৬৯ জনের প্রাণহানি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় সতর্কবার্তা। এআই প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আর কত প্রাণ ঝরলে এই মহাসড়কে কার্যকর ও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে, সেই প্রশ্নই এখন শিবচরসহ এ পথে চলাচলকারী মানুষের।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   সময় বাঁচানো  মহাসড়ক  মৃত্যুর মিছিল  প্রাণ  পদ্মা সেতু  চালু  পঙ্গুত্ব বরণ  স্বজন হারানো  জাজিরা প্রান্ত  ভাঙ্গা  এক্সপ্রেসওয়  সড়ক দুর্ঘটনা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: