মহাবিশ্বের বর্তমান প্রসারণ একসময় থেমে সংকোচনে রূপ নিতে পারে। ছবি : সংগৃহীত মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে হয়েছিল, শেষ পরিণতিই বা কী- বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। এবার মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিগ ব্যাংয়ের আগের অবস্থা সম্পর্কেও নতুন ধারণা পেয়েছেন একদল তাত্ত্বিক পদার্থবিদ। তাদের প্রস্তাবিত তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের বর্তমান প্রসারণ একসময় থেমে সংকোচনে রূপ নিতে পারে। সেই সংকোচন থেকে ঘটতে পারে নতুন একটি বিগ ব্যাং।
মহাবিশ্বের শুরুর সময় সম্পর্কে জানতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেন। এসব গ্যালাক্সির আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে কয়েক বিলিয়ন বছর লেগেছে। ফলে, সেগুলো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের শৈশবের চিত্র পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে, অতীতে ফিরে তাকানোর একটি সীমা রয়েছে। মহাবিশ্ব সৃষ্টির কয়েকশ মিলিয়ন বছর পর নক্ষত্রগুলো আলো ছড়াতে শুরু করে। এর আগের সময়ের সরাসরি চিহ্ন খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এ কারণে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের অতীত বোঝার পাশাপাশি এর ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়েও গবেষণা করছেন। তাদের ধারণা, মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি সম্পর্কে জানা গেলে এর শুরু সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হেনরি তাই এবং তার সহকর্মীরা এ নিয়ে কাজ করছেন। মহাবিশ্বের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণের তথ্য ব্যবহার করে তারা এর ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত সিমুলেশন তৈরি করেছেন। এসব সিমুলেশনে মহাবিশ্বের ঘড়ি কয়েক বিলিয়ন বছর এগিয়ে দিয়ে সম্ভাব্য পরিণতি বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা হয়। এরপর থেকে মহাশূন্য প্রসারিত হচ্ছে এবং গ্যালাক্সিগুলো পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
একসময় বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন, মহাকর্ষের প্রভাবে মহাবিশ্বের এই প্রসারণ ধীরে ধীরে কমে আসবে। তখন এর পরিণতি হতে পারে দুটি ঘটনার যেকোনো একটি।
প্রথম সম্ভাবনাটি হলো ‘বিগ ক্রাঞ্চ’। এ ক্ষেত্রে মহাবিশ্বের প্রসারণ একপর্যায়ে মহাকর্ষের আকর্ষণকে অতিক্রম করতে ব্যর্থ হবে। ফলে, প্রসারণ থেমে গিয়ে মহাবিশ্ব আবার সংকুচিত হতে শুরু করবে। একসময় সবকিছু একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হতে পারে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি ‘বিগ ফ্রিজ’। এ পরিস্থিতিতে মহাবিশ্বের প্রসারণ অব্যাহত থাকবে। গ্যালাক্সি, পদার্থ ও শক্তি ক্রমেই পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে। একপর্যায়ে নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি তৈরির মতো ঘনত্ব আর থাকবে না। মহাবিশ্ব পরিণত হবে অত্যন্ত শীতল ও নিষ্ক্রিয় এক অবস্থায়।
তবে নব্বই দশকের শেষ দিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, মহাবিশ্বের প্রসারণ কমছে না; বরং তা আরও দ্রুত হচ্ছে। এর পেছনে অজানা এক শক্তি কাজ করছে বলে ধারণা করা হয়। বিজ্ঞানীরা এর নাম দেন ‘ডার্ক এনার্জি’ বা অন্ধকার শক্তি।
হেনরি তাই বলেন, ‘বর্তমানে মহাবিশ্বের মোট উপাদানের প্রায় ৭০ শতাংশই ডার্ক এনার্জি।’
ডার্ক এনার্জির প্রকৃত স্বরূপ এখনো অজানা। প্রচলিত একটি ধারণা হলো, এটি মহাশূন্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের গাণিতিক মডেলে একে ‘কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্ট’ বা মহাজাগতিক ধ্রুবকের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ শূন্য মহাশূন্যেও বিদ্যমান শক্তির ধারণা তুলে ধরা হয়।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ডার্ক এনার্জির প্রভাব সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। অথচ এত দিন বিজ্ঞানীরা কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্টকে অপরিবর্তনীয় বলেই ধরে নিয়েছিলেন।
ডার্ক এনার্জির রহস্য ব্যাখ্যা করতে হেনরি তাই ও তার সহকর্মীরা নতুন একটি তত্ত্ব সামনে এনেছেন। তাদের ধারণা, ‘অ্যাকশন’ নামের একটি তাত্ত্বিক কণাও মহাবিশ্বের প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।
ডার্ক এনার্জির বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানে দুটি বড় প্রকল্পের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো হলো ডার্ক এনার্জি সার্ভে (ডিইএস) এবং ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কোপিক ইন্সট্রুমেন্ট। এসব প্রকল্পে কোটি কোটি গ্যালাক্সির অবস্থান পরিমাপ করে মহাবিশ্বের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ডার্ক এনার্জির প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
গবেষকদের মতে, পর্যবেক্ষণগুলো ডার্ক এনার্জির সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই শুধু কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্ট দিয়ে এর আচরণ ব্যাখ্যা করা কঠিন।
হেনরি তাই বলেন, ‘ডার্ক এনার্জি পুরোপুরি কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্ট থেকে এসেছে- এটাই সবচেয়ে সহজ অনুমান। তবে, পর্যবেক্ষণে বিষয়টি তেমন মনে হচ্ছে না।’
অ্যাকশন কণার অস্তিত্ব এখনো পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করা যায়নি। সাধারণ পদার্থের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় শনাক্ত করাও কঠিন।
তাই ও তার দলের তত্ত্ব অনুযায়ী, কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্ট অপরিবর্তিত থাকলেও মহাবিশ্বের প্রসারণে অ্যাকশন কণার ভূমিকা রয়েছে। মহাবিশ্বের শুরুর দিকে এই কণাগুলো প্রসারণে বড় প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু মহাবিশ্ব যত প্রসারিত হয়েছে, অ্যাকশন কণাগুলোও তত ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে, সময়ের সঙ্গে তাদের প্রভাব কমেছে। এ কারণেই ডার্ক এনার্জির প্রভাব পরিবর্তিত হচ্ছে বলে মনে হতে পারে।
গবেষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্টের মান ধনাত্মক নয়, বরং ঋণাত্মক হতে পারে। সাধারণত একে ধনাত্মক ধরে নেওয়া হয়, যা মহাবিশ্বের প্রসারণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু ঋণাত্মক হলে এটি মহাবিশ্বের সবকিছুকে একত্রে টেনে ধরার প্রবণতা তৈরি করবে।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, একসময় অ্যাকশন কণার প্রভাব এতটাই কমে যাবে যে ঋণাত্মক কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্ট মহাবিশ্বের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করবে। তখন প্রসারণের গতি কমে মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে শুরু করবে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ডনোস্তিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফিজিকস সেন্টারের ড. হোয়াং নাহান জানান, তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের প্রসারণ এখনো ত্বরান্বিত হচ্ছে। তবে, আগামী প্রায় ১১ বিলিয়ন বছরের মধ্যে সংকোচনের পর্যায় শুরু হতে পারে। এরপর আনুমানিক আরও ৮ বিলিয়ন বছর পর ঘটতে পারে বিগ ক্রাঞ্চ।
তবে মহাবিশ্ব সংকুচিত হওয়ার পর কী ঘটবে, সে বিষয়ে তাদের মডেল খুব বেশি তথ্য দিতে পারে না। এর কারণ, মহাবিশ্ব সংকুচিত হয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে চলে এলে কোয়ান্টাম মেকানিকস এবং মহাকর্ষ- দুটির প্রভাবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কোয়ান্টাম মেকানিকস অতি ক্ষুদ্র কণার আচরণ ব্যাখ্যা করে এবং মহাকর্ষ বৃহৎ পরিসরের মহাবিশ্বের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এই দুই তত্ত্বকে একসঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাখ্যা করার পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। ফলে মহাবিশ্বের সংকোচনের পর কী ঘটবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না।
কিছু কসমোলজিস্টের ধারণা, বিগ ক্রাঞ্চের পর আবারও বিগ ব্যাং ঘটতে পারে। এ ধারণাকে বলা হয় ‘বিগ বাউন্স’। অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রথমে বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রসারিত হবে, এরপর সংকুচিত হবে এবং সেই সংকোচন থেকেই আবার নতুন বিস্ফোরণ ঘটবে। এভাবে মহাবিশ্ব একটি চক্রের মধ্য দিয়ে চলতে পারে।
বিগ বাউন্স তত্ত্বের আকর্ষণ হলো, এটি শুধু মহাবিশ্বের সম্ভাব্য শেষ পরিণতিই নয়, এর শুরুর ঘটনাও ব্যাখ্যার চেষ্টা করে। তবে, এটি এখনো প্রমাণিত কোনো ধারণা নয়।
হেনরি তাই বলেন, তাদের গবেষণায় মহাবিশ্বের সম্ভাব্য সমাপ্তির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঠিক কীভাবে এর পরিসমাপ্তি ঘটবে, তা এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন।
তার ভাষায়, একজন মানুষের আয়ুষ্কাল অনুমান করা সম্ভব হলেও তার মৃত্যুর নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বা কারণ আগে থেকে বলা যায় না। মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা তেমন।
সূত্র : সায়েন্স ফোকাস
সময়ের আলো/মহু