বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ও তার চিত্রকর্ম ‘দ্য স্টারি নাইট’। ছবি : সংগৃহীত বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’ কেবল শিল্পীর কল্পনার ফসল, নাকি বাস্তব কোনো রাতের আকাশের প্রতিচ্ছবি? দীর্ঘদিনের এই প্রশ্নের নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তাদের গবেষণা বলছে, ১৮৮৯ সালের ২২ জুলাই ফ্রান্সের আকাশের দৃশ্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ছবিটি এঁকে থাকতে পারেন ভ্যান গঘ।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী এলিজাহ জিয়ং-হিউন কিম ও তার সহকর্মীরা গত ২২ অক্টোবর সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ দাবি করেছেন। তাদের মতে, ছবিটির আকাশের সঙ্গে ওই দিনের প্রকৃত আকাশের মিল রয়েছে। এ গবেষণার ফল সত্য হলে ‘দ্য স্টারি নাইট’কে শুধু কল্পনানির্ভর শিল্পকর্ম হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।
গবেষক দলের ভাষ্য, একটি কল্পিত আকাশের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো দিনের বাস্তব আকাশের এতটা মিল কীভাবে সম্ভব, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সাধারণত পর্যবেক্ষণ ও কল্পনাকে আলাদা করে দেখা হলেও ‘দ্য স্টারি নাইট’ দেখায়, দুটি বিষয় একই শিল্পকর্মে একসঙ্গে থাকতে পারে।
ভ্যান গঘের ভাই থিওকে লেখা একটি চিঠির ভিত্তিতে শিল্প-ইতিহাসবিদদের ধারণা, ছবিটি ১৮৮৯ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে আঁকা হয়েছিল। ১৮ জুন বা তার কাছাকাছি সময়ে লেখা চিঠিতে ভ্যান গঘ উল্লেখ করেন, তিনি জলপাই গাছের একটি দৃশ্যের পাশাপাশি তারাভরা রাতের নতুন একটি ছবি তৈরি করেছেন।
এর প্রায় এক মাস আগে ফ্রান্সের সেন্ট-রেমি-দ্য-প্রোভেন্সের একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ভ্যান গঘ। ধারণা করা হয়, হাসপাতালের কক্ষের জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্যই ছবিটিতে তুলে ধরেছেন তিনি। এর কিছুদিন পর অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রায় ছয় সপ্তাহ ছবি আঁকতে পারেননি শিল্পী। এ কারণে ইতিহাসবিদদের বড় অংশ মনে করেন, ‘দ্য স্টারি নাইট’ ওই অসুস্থতার আগেই আঁকা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটির সান মার্কোস ক্যাম্পাসের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডোনাল্ড ওলসনও জুন মাসের সময়কালকে গুরুত্ব দেন। শিল্প-ইতিহাসে জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপস্থিতি নিয়ে কাজ করা এই গবেষকের মতে, ভ্যান গঘের নিজের চিঠিই জুন মাসের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ।
তবে, ছবিটির আকাশের সঙ্গে বাস্তব নক্ষত্রের অবস্থান মেলানোর চেষ্টা নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে সেন্ট-রেমির আকাশের সঙ্গে ছবিটির তারাগুলোর অবস্থান তুলনা করেন। তাদের একজনের ধারণা ছিল, ছবির আকাশটি ১৮৮৯ সালের ১৯ জুনের এবং সেখানে দেখা ঘূর্ণায়মান তারার বিন্যাস মেষ রাশির।
অন্য গবেষক অবশ্য প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের আইক্স-প্রোভেন্সের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই তারিখ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, ১৯ জুন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় সেদিন এমন দৃশ্য দেখা সম্ভব ছিল না। ওই গবেষণায় ছবিটিকে সকালের আকাশের ভিত্তিতে তৈরি একটি ‘মহাজাগতিক কম্পোজিশন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
নতুন গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলভিত্তিক টেলিস্কোপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এসএলএলএবি ইনক’-এর প্রতিষ্ঠাতা কিম অবশ্য আগের গবেষণাগুলোর ফল না জেনেই বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। তার ভাষ্য, আগের গবেষণাগুলোর বিপরীতে তারা স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
টেলিস্কোপের অবস্থান নির্ধারণের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে কিমের জানা ছিল, বছরের বিভিন্ন সময়ে আকাশে কোন তারাগুলো কোথায় অবস্থান করে। তার মতে, যারা টেলিস্কোপকে আকাশের নির্দিষ্ট বস্তুর সঙ্গে সারিবদ্ধ করেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই নক্ষত্রগুলোর অবস্থান মনে রাখেন।
মেষ রাশির তত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ ছিল কিমের। তার যুক্তি, ওই নক্ষত্রমণ্ডলীর তারাগুলো এতটাই অনুজ্জ্বল যে ভোরের আকাশে সেগুলো সহজে চোখে পড়ার কথা নয়। একজন শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করার মতো উজ্জ্বলও নয় সেগুলো।
এর পরিবর্তে ছবির তারাগুলোর বিন্যাসে তিনি বৃষ রাশির হাইয়াডস নক্ষত্রপুঞ্জের ছাপ দেখতে পান। এই নক্ষত্রপুঞ্জের তারাগুলো আকাশে উল্টো ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো আকৃতি তৈরি করে। এ ধারণা যাচাই করতে গবেষক দল ‘প্রোক্রাস্টেস শেপ অ্যানালিসিস’ নামের একটি পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে ছবিতে আঁকা তারাগুলোর বিন্যাসের সঙ্গে নির্দিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলীর মিল পরিমাপ করা হয়।
পদ্ধতিটির কার্যকারিতা যাচাই করতে তারা ভ্যান গঘের আরেকটি আকাশের ছবি ‘স্টারি নাইট ওভার দ্য রোন’ বিশ্লেষণ করেন। ওই ছবিতে স্পষ্টভাবে সপ্তর্ষিমণ্ডল ফুটে উঠেছে। কিমের মতে, সপ্তর্ষিমণ্ডল ছাড়া ভ্যান গঘ অন্য কোনো তারার বিন্যাস এঁকেছেন কী না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। গবেষণায় দেখা যায়, দুটি ছবির ক্ষেত্রেই আঁকা তারার বিন্যাসের সঙ্গে বাস্তব আকাশের মিলের মাত্রা প্রায় একই রকম।
ছবিটি আঁকার সময় আরও নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে গবেষকেরা চাঁদের অবস্থান ও দশা এবং শুক্র গ্রহের অবস্থান বিবেচনায় নেন। তাদের মতে, ১৯ জুন আকাশে চাঁদ ছিল ক্রমবর্ধমান গিব্বাস দশায়। অথচ ‘দ্য স্টারি নাইট’-এ দেখা যায় ক্ষীয়মাণ অর্ধচন্দ্র। পাশাপাশি ছবিতে শুক্র গ্রহের অবস্থানও তাদের বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে।
১৯৮০-এর দশকে এ ধরনের বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক কম্পিউটার সিমুলেশন সহজলভ্য ছিল না। কিম ও তার দল সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১৮৮৯ সালের বিভিন্ন তারিখে মহাজাগতিক বস্তুগুলোর অবস্থান সেকেন্ডের হিসাবেও নির্ণয় করেন। ভ্যান গঘের জানালা থেকে দেখা দৃশ্যের সম্ভাব্য স্থান খুঁজতে কিম ২০১৯ সালের জুন ও জুলাইয়ে ফ্রান্সেও ভ্রমণ করেন।
সব তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষক দল ১৮৮৯ সালের ২২ জুলাইকে সবচেয়ে সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে চিহ্নিত করে। কিম বলেন, সম্ভাব্য স্থানটি খুঁজে পাওয়ার পর সেখানে দাঁড়িয়ে ছবির দৃশ্যের সঙ্গে বাস্তব ভূদৃশ্য মিলিয়ে দেখেন তারা। তার ভাষায়, ১৩০ বছর আগে ভ্যান গঘ যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে চাঁদ, হাইয়াডস ও শুক্র গ্রহের অবস্থানের মিল খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল রোমাঞ্চকর।
তবে, নতুন গবেষণার সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডোনাল্ড ওলসন। তার মতে, গবেষকেরা ছবিটির যে সংকীর্ণ দৃশ্যসীমা নির্ধারণ করেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, ছবিতে থাকা গোল পাহাড় ও খাড়া পাথুরে ঢিবিগুলোকে ধারণ করতে আরও বিস্তৃত দৃশ্যসীমা প্রয়োজন। ফলে, গবেষকদের নির্ধারিত দৃশ্যক্ষেত্র ছবির ভূপ্রকৃতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে নিজের যুক্তির পক্ষে একটি পরীক্ষার প্রস্তাবও দিয়েছেন ওলসন। তার মতে, কাউকে যদি বলা হয় ছবিতে হাইয়াডস নক্ষত্রপুঞ্জ রয়েছে, তাহলে তাকে ওই নক্ষত্রপুঞ্জের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা আলদেবারান শনাক্ত করতে বলা যেতে পারে। বাস্তব আকাশে আলদেবারান হাইয়াডসের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা। কিন্তু ছবিতে এর চেয়ে উজ্জ্বল দেখায় এমন আরও কয়েকটি তারা রয়েছে।
কিম ও তার সহকর্মীরা ছবির সাইপ্রাস গাছের বাঁ পাশে থাকা দুটি তারার একটিকে আলদেবারান হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তবে ওলসনের মতে, অভিজ্ঞ অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও হাইয়াডসের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর ওই দুটি তারার কোনো একটিকে আলদেবারান হিসেবে চিহ্নিত করতে দ্বিধায় পড়তে পারেন। তাই ছবিটির আকাশের সঙ্গে ১৮৮৯ সালের ২২ জুলাইয়ের আকাশের মিল নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ রয়েছে।
সূত্র : সায়েন্স নিউজ
সময়ের আলো/মহু