ছবি : সংগৃহীত মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি সৃষ্টিকারী দেশ ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র আছে কি না তা নিয়ে ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বহির্বিশ্বকে ধোঁয়াশায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি সরকার। এবার সম্ভবত সে ধোঁয়াশা কাটতে চলেছে। ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপের কারণে দীর্ঘদিনের এই নীতিতে পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে বলে এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
বিশ্লেষণী প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির দীর্ঘদিনের ‘অস্বীকার বা অস্পষ্টতার নীতি’ এখন নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ এবং সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি এ বিতর্ককে আরও ভারী করে তুলেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত জুনে কংগ্রেসের এক শুনানিতে ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি কার্যত স্বীকার করে নেন। তিনি বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশই মনে করে ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র আছে। তবে দেশটি কখনো প্রকাশ্যে তা স্বীকার করেনি। যুক্তরাষ্ট্রও পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করে না।
টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রো এ নীতির সমালোচনা করে বলেন, ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্পষ্ট অবস্থান এখন পুরোনো, বেপরোয়া ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ইসরাইলের সঙ্গে একই যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমারেখা কী, তা যুক্তরাষ্ট্রের জানা প্রয়োজন।
ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহের সূত্রপাত ১৯৬০ সালে। ওই বছরের শুরুর দিকে কয়েকজন মার্কিন কূটনীতিক ইসরাইলি হেলিকপ্টারে করে ভ্রমণের সময় নেগেভ মরুভূমিতে নির্মাণাধীন একটি স্থাপনা দেখতে পান।
ডেড সির পশ্চিমে প্রায় ২০ মাইল দূরের ওই স্থাপনাটি কী, জানতে চাইলে ইসরাইলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আদি কোহেন সেটি একটি ‘বস্ত্র কারখানা’ বলে জানান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা পরে জানতে পারেন, সেটি আসলে ডিমোনা পারমাণবিক স্থাপনা। বর্তমানে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভে সংরক্ষিত কূটনৈতিক নথিতে বলা হয়েছে, কয়েক মাস পর মার্কিন গোয়েন্দারা নির্মাণাধীন স্থাপনাটির প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে পারলে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওগডেন রিড আদি কোহেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে কোহেন বিষয়টি প্রথমে হালকাভাবে নিলেও পারমাণবিক চুল্লিটি ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা সম্পর্কে তার ধারণা ছিল বলে মার্কিন নথিতে উল্লেখ করা হয়।
এরপর থেকে প্রায় ৬০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দুই দেশই বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে নীরবতা বজায় রেখেছে। ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রসঙ্গে ‘বস্ত্র কারখানার’ বিষয়টি একধরনের প্রচলিত রসিকতা বা সাংকেতিক শব্দে পরিণত হয়েছে। ইসরাইলি-আমেরিকান ইতিহাসবিদ অ্যাভনার কোহেনের ভাষায়, বিষয়টি এখন বিশ্বের সবচেয়ে খারাপভাবে গোপন রাখা রহস্যগুলোর একটি। দুই দেশের নীতি হলো পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করে ইঙ্গিতপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই এ নীতির সূচনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উভয়েই আশঙ্কা করেছিল, ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন নিয়ে আরব দেশগুলোও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে। একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি পেলে ইসরাইলকে কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতো।
১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার একটি ইউরেনিয়াম স্থাপনায় অস্ত্র তৈরির উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কয়েকশ পাউন্ডের ঘাটতি ধরা পড়ে। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একাংশের ধারণা ছিল, ওই ইউরেনিয়াম ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিক একটি প্রামাণ্যচিত্রেও এমন সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
একই বছর ইসরাইল সফরে গিয়ে তৎকালীন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেনরি কিসিঞ্জার মার্কিন কর্মকর্তাদের জানান, ইসরাইল ইতিমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি শুরু করেছে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। ইসরাইলের তৎকালীন উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী শিমন পেরেসসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে ছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
১৯৬৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কাছে পাঠানো এক স্মারকে কিসিঞ্জার বলেন, অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত, ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানাকে যেন আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হতে না দেওয়া হয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওই বছরের সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউসে নিক্সন ও ইসরাইলের নতুন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের একান্ত বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়ে থাকতে পারে। বৈঠকের লিখিত কোনো নথি পাওয়া যায়নি। তবে পরবর্তী সময়ে কিসিঞ্জারের এক স্মারকে বলা হয়, ইসরাইল যেন প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার ঘোষণা না দেয় বা পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা না চালায়, সেটিই ছিল নিক্সনের প্রধান উদ্বেগ। এরপর ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৭০-এর দশকে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সরকারি কর্মকর্তাদের অসাবধানতাবশত দেওয়া তথ্য থেকে ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হতে থাকে। ১৯৮৬ সালে ডিমোনা স্থাপনার সাবেক কর্মী মরদেকাই ভানুনু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম সানডে টাইমসের কাছে ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য ও গোপনে তোলা ছবি প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এক কর্মকর্তা ভানুনুকে ইতালির রোমে নিয়ে যান। সেখানে তাকে মাদক প্রয়োগ করে অচেতন করার পর আন্তর্জাতিক জলসীমায় অপেক্ষমাণ ইসরাইলি নৌবাহিনীর একটি জাহাজে তুলে নেওয়া হয় বলে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এক বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে রাষ্ট্রদ্রোহ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ভানুনুর বিচার হয়। তাকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যার অধিকাংশ সময় তাকে নির্জন কারাবাসে থাকতে হয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে অস্পষ্টতা বজায় রাখার আগের যুক্তিও অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আরব দেশগুলোর মাধ্যমে বড় ধরনের অস্তিত্বগত হুমকির আশঙ্কা কমে যায়। তবে ২০১৮ সালে নিউইয়র্কার সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি কর্মকর্তারা তখন গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে লিখিত নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন, যাতে দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া না হয়।
এরপরও ইসরাইলের সরকারি অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসেনি। দেশটির সরকার এখনও পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি স্বীকার করে না। পারমাণবিক হুমকি নিয়ে কাজ করা সংস্থা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের হিসাবে, ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারে প্রায় ৯০টি ওয়ারহেড রয়েছে।
কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দীর্ঘদিনের নীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধ চালালেও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, সামরিক অভিযান দিয়ে তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরমাণু কৌশলবিদ ম্যাথিউ ক্রোয়েনিগের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একাধিকবার বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে সৌদি আরবও তা তৈরির পথে এগোবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনায় আছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন সাপেক্ষে এ চুক্তির আওতায় সৌদি আরব নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে কয়েক মাসের যুদ্ধের পরও ইরানের কাছে প্রায় ১ হাজার পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছর মার্কিন বোমারু বিমানের হামলায় এসব ইউরেনিয়ামের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার নিচে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করা হয়। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পারমাণবিক বিস্তার রোধ বিশেষজ্ঞ জেমস অ্যাক্টনের ধারণা, আগামী তিন বছরের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতা কত দিন বজায় থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন কংগ্রেস সদস্য কাস্ত্রোর মতে, ১৯৫০, ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের অনেক পার্থক্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আসেনি। তার ভাষায়, ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে অস্পষ্টতা বজায় রাখার নীতি এখন পরিত্যাগ করার সময় এসেছে। তবে ক্রোয়েনিগ মনে করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালালে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসরাইলকে তার পারমাণবিক কৌশল ও নীতি প্রকাশ্যে তুলে ধরা লাগতে পারে, যাতে তেহরানের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য পারমাণবিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হলে এখনই ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করার প্রয়োজন দেখছেন না তিনি।
এদিকে ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমারেখা কী, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি বলে মনে করেন কাস্ত্রো। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকা অবস্থায় ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তবে রুবিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেছেন, এ ধরনের বিষয়ে বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে