যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে তৃতীয় দফার একটি যুদ্ধ হয়তো ঘনিয়ে আসছে। ছবি : সংগৃহীতযুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে তৃতীয় দফার একটি যুদ্ধ হয়তো ঘনিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে নতুন করে সামরিক অভিযানের কথাও সম্ভবত ভাবছে। তারা মনে করছে, হঠাৎ করে হামলা চালিয়ে ও উত্তেজনা বাড়িয়ে তারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।
তাদের ধারণা, আরও বড় ও শক্তিশালী আক্রমণে ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষাও হলো তাদের একেবারে ‘চিরতরে শেষ করে দেওয়া’ যাবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আগের মতো নেই। আগের যুদ্ধগুলো থেকে ইরান সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আরেকটি যুদ্ধের জন্য নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি শক্ত করা, নিজেদের জবাব দেওয়ার কৌশল তৈরি করা ও বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ঠিক করার জন্য তারা যথেষ্ট সময় পেয়েছে। তাই এবারের যুদ্ধটি সম্পূর্ণ নতুন এক পরিস্থিতিতে শুরু হবে।
আবার যুদ্ধ শুরু করা শুধু বোকামিই হবে না, বিপজ্জনকও বটে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের এক মন্তব্য প্রতিবেদনে ইরানি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও গবেষক মোহাম্মদ আমিন আহমদি এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য ইংরেজি প্রতিবেদনটির ভাবানুবাদ তুলে ধরা হলো এখানে।
আগের দুটি যুদ্ধ থেকে তেহরান পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক শক্তি কেমন, তারা কীভাবে আক্রমণ করে এবং ইরানের নিজের প্রতিরক্ষায় কী কী ঘাটতি আছে। এরপর থেকে ইরান সেই দুর্বলতাগুলোর কিছু অংশ দূর করতে ও নিজেদের সামরিক সক্ষমতা জোরদার করতে সময় পেয়েছে। আরেকটি বিষয় খেয়াল করা দরকার, এবার হঠাৎ করে হামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম। আগের যুদ্ধগুলোতে প্রথম দিকের আক্রমণগুলো ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর অনেককে একদম অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল। তবে এবার ইরান তাদের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েছে।
আগের সংঘাতগুলোর তুলনায় এখন কমান্ডার ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মানে এই নয় যে, ইরান সব ধরনের হামলার চেষ্টা রুখে দিতে পারবে, তবে আগের মতো হুট করে বড় ধরনের চমক দেখানোর সুযোগ বেশ কমে গেছে। পাশাপাশি আগের দুটি যুদ্ধের সামরিক ও নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা থেকেও ইরান অনেক কিছু শিখেছে। মার্কিন দুর্বলতাগুলো কোথায় এবং তাদের নিজস্ব সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে কীভাবে মার্কিনদের আরও বেশি ক্ষতি করা যায়, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা এখন অনেক স্পষ্ট। এই অভিজ্ঞতা নতুন সংঘাতে ইরানের প্রতিরোধকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। তেহরান তাদের আগের অভিযানগুলো পর্যালোচনা করার, কোন পদ্ধতিগুলো কাজে লেগেছে আর কোনগুলো লাগেনি তা চিহ্নিত করার এবং আরও বাস্তবসম্মত বিকল্প প্রস্তুত করার সময় পেয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর মানে হলো— নতুন কোনো যুদ্ধ আগের দুটির মতো পরিস্থিতিতে শুরু হবে না। ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত, আকস্মিক আক্রমণের মুখে কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক অভিযানগুলোর জবাব কীভাবে দিতে হবে সে সম্পর্কে আরও ভালোভাবে অবহিত।
বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং নেতাদের বাগাড়ম্বরে এমনটা মনে হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল পরের ধাপে সংঘাত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে এর বিপরীতে ইরানের হাতেও নিজেদের লড়াইয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার উপায় রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা গত ৩১ অক্টোবরে যেমনটা বলেছেন, নতুন যুদ্ধ হয়তো আগের মতো নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না এবং ‘এর জবাব দিতে হবে তাৎক্ষণিক, কার্যকর ও কোনো ভৌগোলিক সীমানা না মেনে।’ আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি তাদের হামলা বাড়িয়ে দেয়, তা হলে তেহরানও তাদের পাল্টা হামলার পরিধি অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ইরানের সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো যদি হামলার শিকার হয়, তা হলে ইরানও পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে পালটা আঘাত হানার কথা ভাবতে পারে। এতে এই অঞ্চলের সব দেশের জন্যই যুদ্ধের খরচ ও ক্ষতি অনেক বেড়ে যাবে।
শুধু তেল নয়, বৈশ্বিক বাজারে— বিশেষ করে আমেরিকার বাজারে চাপ সৃষ্টি করার আরও কিছু উপায় ইরানের হাতে রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো সমুদ্রের নিচের ইন্টারনেট ক্যাবলগুলো নষ্ট করা। এই ক্যাবলগুলোর মাধ্যমেই আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান হয় এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ডিজিটাল সেবাগুলো চলে। এগুলোতে সামান্য সমস্যা হলেই লেনদেন ও বাজারের কার্যক্রমে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
এমন পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে এক কঠিন বিপদে ফেলবে। আমেরিকার এই অঞ্চলের অনেক বন্ধুরাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো শান্তি ও স্থিতিশীলতা। তাদের তেল রফতানি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং উন্নয়নের কাজগুলো ঠিকঠাক চালাতে হলে নিরাপদ পরিবেশ ও অক্ষত অবকাঠামো দরকার। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে এই স্বার্থগুলো বড় বিপদের মুখে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের মিত্রদের কাছ থেকেই চাপে পড়ে যাবে। মিত্ররা হয়তো চাইবে যুদ্ধ যেকোনো মূল্যে থামুক, এমনকি ওয়াশিংটন তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলেও। এর ফলে আমেরিকা চাইলেও আর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি এখনও ইরানের অন্যতম বড় কৌশলগত হাতিয়ার। আগের যুদ্ধের পর থেকেই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তেলের দাম অনেক বেড়ে গেছে, আর বিশ্ব অর্থনীতিও জ্বালানি সরবরাহ একটু ব্যাহত হলেই খুব দ্রুত নড়েবড়ে হয়ে পড়ে। যদি আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয় এবং ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে আরও কড়াকড়ি আরোপ করে, তা হলে বিশ্বে বড় ধরনের তেল সংকট দেখা দিতে পারে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে এখন যে অর্থনৈতিক চাপ দেখা যাচ্ছে এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, তা এমনিতেই কম জ্বালানি সরবরাহের ফল।
যদি সংঘাত আরও বাড়ে এবং তেল সরবরাহ আরও কমে যায়, তা হলে এতদিন ধরে আটকে থাকা অর্থনৈতিক চাপ একসঙ্গে বেরিয়ে আসবে। এর ফলে তেল ও জ্বালানির দাম হু হু করে অনেক বেড়ে যাবে। এটি ওয়াশিংটনের সামনে এক কঠিন পরীক্ষা এনে দাঁড় করাবে। একদিকে তাদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হবে, অন্যদিকে সামলাতে হবে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা। এই যুদ্ধে ইরানের হয়তো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে, কিন্তু তারা চাইলে পুরো বিশ্বব্যবস্থার ওপর একটা বড় ধরনের তেল সংকট চাপিয়ে দিতে পারে। যে যুদ্ধ ইরানকে হারানোর উদ্দেশ্যে শুরু করা হবে, তা শুধু পণ্ডশ্রমই প্রমাণিত হবে না, বরং এমন বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে যা আমেরিকার স্বার্থ, তাদের বন্ধুদের স্বার্থ এবং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে। এমনকি মাত্র কয়েক দিনের জন্যও যদি ইন্টারনেট বন্ধ থাকে, তা হলে বড় ধরনের অশ্চিয়তা ও আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিটকয়েন ও অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদ পুরোপুরি ইন্টারনেট সংযোগ ও ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল।
এখানে ইন্টারনেট কতক্ষণ বন্ধ থাকল তার চেয়ে বড় কথা হলো এই বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়াই যথেষ্ট। ইন্টারনেট ছাড়া মাত্র কয়েক ঘণ্টার মতো অল্প সময়ও বড় ধরনের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে বাজারে ধস নামতে পারে। এখন এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে বিটকয়েনের দাম প্রায় ২০ হাজার ডলারে নেমে আসতে পারে, যার ফলে ক্রিপ্টো বাজারের মূল্যের বড় একট অংশ হারিয়ে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই, এ ধরনের সমস্যা অন্য আর্থিক বাজারগুলোকেও ছাড়বে না, যা পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
পরিশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইরের কাছে হয়তো মনে হতে পারে, আরেকটি যুদ্ধ মানেই ইরানকে দুর্বল করার আরেকটি সুযোগ। কিন্তু সত্যি বলতে, ইরান এখন অনেক বেশি প্রস্তুত, আগের যুদ্ধ থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে এবং এই যুদ্ধের ঝুঁকি ও কৌশলগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা অনেক পরিষ্কার। আক্রমণ যদি আরো ব্যাপক হয়, তা হলে ইরানও তাদের পাল্টা আঘাতের পরিধি অনেক বাড়িয়ে দেবে। হরমুজ প্রণালি, বিশ্ব তেলের বাজার এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা— সবকিছুই ওয়াশিংটনের ওপর বড় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যুদ্ধে ইরান মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরও এই বড় যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ফল ভোগ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমেরিকা তাদের প্রধান লক্ষ্য অর্জন না করেই কি এই বিপুল খরচ ও ক্ষতি সামলাতে পারবে? আরেকটি যুদ্ধ যদি জ্বালানি সংকট, অঞ্চলের মধ্যে বড় অশান্তি ও মার্কিন নেতৃত্বের ওপর থেকে ভরসা কমিয়ে দেয়, তা হলে যুদ্ধ শেষে আমেরিকা আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে পড়বে। যে যুদ্ধ ইরানকে হারানোর উদ্দেশ্যে শুরু করা হবে, তা শুধু পণ্ডশ্রমই প্রমাণিত হবে না, বরং এমন বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে যা আমেরিকার স্বার্থ, তাদের বন্ধুদের স্বার্থ এবং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে