পাঁচ ধরনের দায়িত্ব বহনের ধারণা উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে পারে। ছবি : এআই উদ্যোক্তাদের অনেক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর সক্ষমতা প্রায়ই প্রশংসিত হয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে কর্মী পরিচালনা, গ্রাহকসেবা, বেতন-ভাতা পরিশোধ- সবকিছুতেই তাদের সরাসরি যুক্ত থাকতে দেখা যায়। কিন্তু সব কাজ নিজে করতে গিয়ে একজন উদ্যোক্তা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন। এমনকি তার অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে ‘দ্য ফাইভ ক্যারিজ’ বা পাঁচ ধরনের দায়িত্ব বহনের ধারণা উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
ক্যারি আপ : ওপর মহলের প্রত্যাশা সামলানো
উদ্যোক্তাদের হয়ত সরাসরি কোনো বস নেই। কিন্তু বিনিয়োগকারী, ঋণদাতা, পরিচালনা পর্ষদ, গ্রাহক এবং নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হয়। ‘ক্যারি আপ’ বলতে এসব প্রত্যাশা অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে বাস্তবতার ভিত্তিতে সেগুলো পরিচালনা করাকে বোঝায়।
ধরা যাক, একজন উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীদের কাছে দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ তার দলের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই। এ অবস্থায় দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হবে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা এবং যুক্তিসংগত প্রত্যাশা তৈরি করা।
এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত- কার কার প্রত্যাশা তিনি পূরণের দায়িত্ব নিয়েছেন? সেই প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি কি বাস্তবসম্মত? ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় কখনো কখনো তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে হতাশ করার সাহসও নেতৃত্বের অংশ।
ক্যারি ডাউন : কর্মীদের সক্ষম করে তোলা
একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা দিকনির্দেশনা, প্রয়োজনীয় উপকরণ, কাজের সুযোগ এবং উপযুক্ত পরিবেশের জন্য উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করেন। তবে, তাদের প্রতিটি সমস্যা নিজের হাতে সমাধান করাই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় নয়। যে উদ্যোক্তা কর্মীদের সব সমস্যার সমাধান নিজেই করে দেন, তিনি হয়ত নিজেকে অপরিহার্য মনে করতে পারেন। কিন্তু এতে কর্মীদের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়।
কার্যকর নেতৃত্বের কাজ হলো স্পষ্ট নির্দেশনা, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, যাতে কর্মীরা ধীরে ধীরে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
তাই প্রতিটি সমস্যার সমাধান নিজে না করে উদ্যোক্তার ভাবা উচিত, কীভাবে কর্মীদের এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যাতে তারা তার সরাসরি সহায়তা ছাড়াই কাজটি করতে পারেন। এর অর্থ কর্মীদের কম সহায়তা করা নয়; বরং এমন সহায়তা দেওয়া, যা তাদের দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে তোলে।
ক্যারি অ্যাক্রস : পারস্পরিক সম্পর্কের যত্ন নেওয়া
উদ্যোক্তা হওয়া একক কোনো অর্জন নয়। ব্যবসায়িক অংশীদার, জীবনসঙ্গী, সহকর্মী, সরবরাহকারী ও পেশাগত সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্কও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ব্যবসার জরুরি কাজ সামলাতে গিয়ে অনেক সময় এসব সম্পর্কের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়া হয় না। কাজ শেষে যতটুকু সময় বা শক্তি অবশিষ্ট থাকে, সেটুকুই তাদের জন্য বরাদ্দ হয়।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৪ সালের ‘ওয়ার্ক ইন আমেরিকা’ জরিপে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ কর্মী কর্মদিবসে সাধারণত মানসিক চাপ বা অস্থিরতায় ভোগেন। যেসব কর্মীর কর্মক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা কম, তাদের ক্ষেত্রে এই হার ৬১ শতাংশ। জরিপটি বিশেষভাবে উদ্যোক্তাদের নিয়ে না হলেও কর্মক্ষেত্রে সুস্থ সম্পর্ক ও নিরাপদ পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরে।
‘ক্যারি অ্যাক্রস’-এর মূল কথা হলো, সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়, সহযোগিতা করা; অনুমানের ওপর নির্ভর না করে খোলামেলা যোগাযোগ রাখা। কারণ, উদ্যোক্তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব তার অধীন কর্মীদের বাইরেও অনেকের ওপর পড়ে। এ ক্ষেত্রে ভাবতে হবে, নিজের সময় ও মনোযোগের কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোর পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে।
ক্যারি ফরওয়ার্ড : ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া
তাৎক্ষণিক কাজ ও সমস্যা সামলাতে গিয়ে অনেক উদ্যোক্তা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেন না। অথচ ব্যবসার স্থায়িত্বের জন্য ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, উত্তরাধিকার পরিকল্পনা, আর্থিক নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং নেতৃত্বের নতুন প্রজন্ম তৈরি করা জরুরি।
ধরা যাক, সমান লাভজনক দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন দুই উদ্যোক্তা। একজন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজেই নেন। অন্যজন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করেন, উত্তরসূরি তৈরি করেন এবং এমন একটি নেতৃত্ব দল গড়ে তোলেন, যারা তার অনুপস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারে।
বর্তমানে দুজনই সফল হলেও ভবিষ্যতের জন্য দ্বিতীয় উদ্যোক্তার প্রস্তুতি বেশি। কারণ, তিনি প্রতিষ্ঠানকে একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল না রেখে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করছেন।
তাই উদ্যোক্তাদের শুধু আজকের প্রয়োজন মেটানোর কথা ভাবলে চলবে না। বরং আজ কী গড়ে তুললে আগামী দিনেও প্রতিষ্ঠান ও এর সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলো সফল হতে পারবে, সেই পরিকল্পনা করতে হবে।
ক্যারি উইদিন : নিজের যত্ন নেওয়া
উদ্যোক্তাদের দায়িত্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হতে পারে নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। ব্যবসার সঙ্গে অতিরিক্ত একাত্ম হয়ে পড়লে অনেকেই ব্যক্তিগত জীবন ও সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেন। কাজের চাপে ঘুম কমে যায়, ব্যায়ামের সময় থাকে না, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো অনিয়মিত হয়ে পড়ে। বিশ্রাম নেওয়ার বিষয়টিও যেন পরবর্তী লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়।
কিন্তু নিজের শক্তি ও সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সুযোগ না দিলে দীর্ঘদিন ব্যবসার দায়িত্ব সামলানো সম্ভব নয়। একজন উদ্যোক্তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের সঙ্গে জড়িত।
‘ক্যারি উইদিন’ বলতে কঠোর পরিশ্রম এড়িয়ে চলাকে বোঝায় না। বরং ব্যবসার পেছনে যে মানুষটি কাজ করছেন, তার সুস্থতা ও সক্ষমতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করা বোঝায়। যে সাফল্যের বিনিময়ে স্বাস্থ্য, সম্পর্ক ও জীবনের উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়, সেই সাফল্যের অর্থ নিয়েও উদ্যোক্তাদের ভাবা প্রয়োজন।
‘দ্য ফাইভ ক্যারিজ’ উদ্যোক্তাদের ওপর নতুন ৫টি দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার কোনো পদ্ধতি নয়। বরং ইতোমধ্যে যেসব দায়িত্ব তারা পালন করছেন, সেগুলোকে ৫টি দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নের একটি কাঠামো।
এ জন্য প্রথমে নিজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এরপর সেগুলো কোন ধরনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, তা চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি ৩টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে- এখন কী কী দায়িত্ব বহন করছি, ভবিষ্যতে কোন দায়িত্বগুলো নিতে হবে এবং কোন বোঝাগুলো অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া বা ছেড়ে দেওয়া সম্ভব?
এভাবে দেখা যেতে পারে, কিছু দায়িত্বে আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, কিছু কাজ অন্যদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত, আবার কিছু দায়িত্ব শুরু থেকেই একা বহন করার কথা ছিল না।
উদ্যোক্তা জীবনে দায়িত্ব ও চাপ থাকবেই। লক্ষ্য সব চাপ থেকে মুক্ত হওয়া নয়; বরং কোন দায়িত্ব নিজে পালন করবেন, কোনটি ভাগ করে নেবেন এবং কোনটি ছেড়ে দেবেন- সে বিষয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ একজন উদ্যোক্তার সাফল্য শুধু কতটা দায়িত্ব একা সামলাতে পেরেছেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং তিনি কী গড়ে তুলেছেন, কত মানুষের কাজে এসেছেন এবং নিজের অর্জন উপভোগ করার মতো শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছেন কি না- সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র : এন্ট্রারপ্রেনার
সময়ের আলো/মহু