বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল অনন্য ও গণমানুষের গণযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার ইমেজের বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা নিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কবিতাগুলো সবসময় উন্মুখ। একজন পিপাসু কবিতার পাঠক মুক্তিযুদ্ধের কবিতায় বহু বর্ণিল ও বিভিন্ন ভূগোলের খোঁজ পেয়ে যাই, পেয়ে যাই স্বদেশের মুখ, অভিঘাত ও মানুষের আর্তস্বর।
জসীম উদ্দীনের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ নামে কবিতাটির উদাহরণ দিই, যা লেখা হয়েছে ঢাকায়, ১৯৭১ সালের ৬ জুলাই। সেই সময়ের পরিবেশে অবস্থান করে লেখা এই কবিতায় তাজা অনুভূতি ও আবেগ লেপ্টে থাকা স্বাভাবিক, সে জন্য পাঠক হিসেবে এক ভিন্ন বোধের মুখোমুখি আমরা হয়ে যাই-
‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, মৃত্যু পিছনে আগে,
ভয়াল বিশাল নখর মেলিয়া দিবস রজনী জাগে।’
কবিতার শুরুতে এভাবে উল্লিখিত মুক্তিযোদ্ধার চিত্র এঁকেছেন তিনি, তারপর মুক্তিযোদ্ধাদের দৃঢ় অবস্থানের কথা বলেছেন, কবিতাটির শেষে আশাবাদী হয়ে স্বপ্নের কথা বলেছেন, যা এই ভূখণ্ডের মানুষেরই আকাক্সক্ষা মূর্ত করে তুলেছেন কবি। তার এই কবিতার শেষ পঙ্ক্তিগুলো-
‘এ সোনার দেশে যতদিন রবে একটিও খান-সেনা,
ততদিন তব মোদের যাত্রা মুহূর্তে থামিবে না।’
মুক্তিযুদ্ধের কিছু কবিতা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে রচিত হয়েছিল, এসব কবিতা প্রণোদনা দিয়েছে- স্বাধিকার ও গণআন্দোলনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে করেছে আরও শানিত। কবি সিকান্দার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’ নামে সেই বিখ্যাত কবিতাটির উদাহরণ দিই, তার প্রথম কয়টি লাইন-
‘রক্ত চোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া
আমার বছরগুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয়
কণ্ঠনালীর খুনপিয়াসী ছুরি,
কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে
কেউটে সাপের ঝাঁপি।
শামসুর রাহমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বহু কবিতা রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলো- ‘গেরিলা’, ‘এখানে দরজা ছিল’, ‘সম্পত্তি’, ‘পথের কুকুর’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তুমি বলেছিলে’ ও ‘কাক’। শামসুর রাহমান তার নিজস্ব বোধ থেকে উৎসারিত বিবেচনা থেকে এদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা বা উল্লেখযোগ্য অভিঘাতকে কবিতায় প্রাণ দিয়েছেন, সেই বোধ জনগণের মুক্তির চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে। তার স্বদেশানুভূতি এই ভূখণ্ডের জনগণের কাক্সিক্ষত চেতনায় পরিব্যাপ্ত করেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তার বহুল পঠিত ও উচ্চারিত কবিতাগুলোর উদাহরণ না দিয়ে, তার ‘কাক’ নামে পুরো ভিন্ন ধরনের চার লাইনের কবিতাটি তুলে ধরছি-
‘গ্রাম্যপথে পদচিহ্ন নেই। গোঠে গরু
নেই কোনো, রাখাল উধাও, রুক্ষ সরু
আল খাঁ খাঁ পথপাশের্^ বৃক্ষেরা নির্বাক;
নগ্ন রৌদ্র চতুর্দিকে, স্পন্দমান কাক, শুধু কাক।’
বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার সচল সজীব-প্রবাহে এক উজ্জ্বল কবি প্রতিকৃতি কবি হাসান হাফিজুর রহমান। ‘তোমার আপন পতাকা’ নামে দীর্ঘ কবিতায় হাসান হাফিজুর রহমান তার স্বদেশকে টেনে এনেছেন। যে স্বদেশ পাকিস্তানি উপনিবেশ হিসেবে শৃঙ্খলে ছিল বন্দি। তখন নিজস্ব আত্মপরিচয়ের মর্যাদা ছিল সঙ্কোচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত। রাষ্ট্রের কৃত্রিম বন্ধনে স্বাধিকারের তুল্য-মূল্য ছিল উপেক্ষায় রক্তাক্ত। আপন স্বদেশের করুণ পরিণতি তার মস্তিষ্কের কোষে প্রবহমান চেতনাকে করেছে বিবেক-ব্যঞ্জনায় শানিত। ‘তোমার আপন পতাকা’ নামে এই কবিতার প্রথম স্তবকে তিনি উল্লেখ করেন-
‘এবার মোছাব মুখ তোমার আপন পতাকায়।
হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল
রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে শ্যামকান্ত ফুল
নিঃশঙ্ক হাওয়ায় আজ ওড়ে, দুঃখভোলানিয়া গান গায়।
মোছাব তোমার মুখ আজ গাঢ় পতাকায়।’
সৈয়দ শামসুল হক, তার লেখা বেশ কিছু কবিতায় খুব সচেতনভাবে গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে গভীর ধ্যানমগ্নতা-অভিজ্ঞান-সংবেদ-ধীশক্তি-কল্পনা ও ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে নির্মাণ করেছেন। তার আত্মমুখী প্রেমচেতনার কবিতার পাশাপাশি এসব কবিতার জগৎ বহু বর্ণিল ও বিচিত্রমুখী বোধভাষ্যি নিয়ে চৈতন্য-জাগরণের কবিতা হয়ে উঠেছে। ‘আর কত রক্তের দরকার হবে’ নামক কবিতায় সৈয়দ শামসুল হক উচ্চারণ করেন এমনই পঙ্ক্তি- যে পঙ্ক্তিতে মাতৃভূমির জন্য রক্তদানের কথা উচ্চকিত হয়, পাশাপাশি- এই দীর্ঘ কবিতায় কবি তার বাংলাদেশকে এমন এক অস্তিত্ব নিয়ে ইন্দ্রিয়গোচর করে তোলেন, যা থেকে পাঠকমাত্রই সংবেদনা নিয়ে এক স্বদেশমুখী জাগতিকতা খুঁজে পাবেন :
‘বল তবে, আর কত রক্তের দরকার হবে
এই একটি শব্দ লিখতে, মা?
সাইয়িদ আতীকুল্লাহ সমকালীন কবিতার ধারায় ভিন্নমাত্রা, ভিন্নবোধ ও ভিন্ন সৌকর্যে তার কবিতাকে নির্মাণ করেছেন। হ্যাঁ, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ এক ভিন্ন ধরনের বোধ ও প্রশ্ন ‘আরো একবার ভালোবেসে’ নামক কবিতায় তুলে ধরেন-
‘শুনিনি কোনোদিন, কোনো দেশে কোনো কালে
মানুষের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতা গিয়েছে বৃথাই, চোখের আড়ালে’
এমন এক চিরন্তন জিজ্ঞাসা পাঠকের মাঝে তিনি উসকে দিয়ে কবিতার বোধকে তাৎপর্যময় দিশায় উত্তীর্ণ করেন।
শহীদ কাদরী এই দেশের ভাষা, সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য দিক তার কবিতায় মূর্ত হয়েছে মূল বিষয় হিসেবে, সেসঙ্গে যুদ্ধবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদবিরোধী এবং সামরিক-স্বৈরাচারবিরোধী এক ধরনের আন্তর্জাতিক চেতনাও তার কবিতায় আমরা খুঁজে পাই। ‘ব্ল্যাকআউটের পূর্ণিমায়’ নামে কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বদেশ ভিন্ন ব্যঞ্জনায় উচ্চকিত হয়েছে-
‘একটি আংটির মতো তোমাকে পরেছি স্বদেশ
আমার কনিষ্ঠ আঙুলে, কখনো উদ্ধত তলোয়ারের মতো
দীপ্তিমান খামের বিস্তারে, দেখেছি তোমার ডোরাকাটা
জ¦লজ¦লে রূপ জ্যোৎস্নার।’
বেলাল চৌধুরীর কবিতায় এক ধরনের রোমান্টিকতার আবহ থাকলেও তার কবিতার মূল দ্যোতনা হিসেবে স্বদেশচেতনা থেকে শুরু করে অন্তর স্পর্শে সাধারণ মানুষের আর্ত-হাহাকার ও জীবন উন্মুখ হতে আমরা দেখি। আর সেই কারণে ‘একদিন চিরদিন জয়বাংলা’ নামক কবিতায় তিনি বলেন-
‘জয়বাংলা ছিল আছে একদিন চিরদিন দুর্জয় এক সাহসের নাম
জয়বাংলা ছিল আছে একদিন চিরদিন দুর্বার এক সংগ্রামের নাম
জয়বাংলা ছিল আছে একদিন চিরদিন আট কোটি কোকিলের ঐকতান
জয়বাংলা ছিল আছে একদিন চিরদিন কল্লোলিত সমুদ্রের উত্তাল গর্জন’
রফিক আজাদ আমাদের বাংলা কবিতার মূলধারা, বিশেষত বাংলাদেশের কবিতার একজন বিশিষ্ট কবি।
‘সৌন্দর্য-সৈনিকের শপথ প্যারেড’ নামে কবিতায় তার উচ্চারণ-
‘ট্রিগারে আঙুল রেখে, পুনর্বার, বুঝে নিতে চাই
অধিনায়কের কণ্ঠে উচ্চারিত গাঢ় শব্দাবলি,
শপথ-প্যারেডে : ‘তোমাদের মনে রাখা প্রয়োজন
এই যুদ্ধ ন্যায় যুদ্ধ’
একজন মুক্তিযোদ্ধা কবি হিসেবে তার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ তাজা, গন্ধময়, দৃশ্যময়, শব্দময় ও বর্ণময় হতে দেখি।
সিকদার আমিনুল হক স্বদেশের আর্তরবকে ভাষা দিয়েছেন, তার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের চিত্রও এসেছে। আমার মনে হয়েছে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার বিভিন্ন বোধকে নিজের জিজ্ঞাসার রসায়নে মূর্ত করেছেন, কবিতায় দিয়েছেন প্রাণ। ‘কোনো এক দগ্ধ দিনে’ নামে কবিতায় সেই উচ্চারণ-
‘স্বাধীনতা আমি তোমার জন্যে
এই জতুগৃহে, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট আর
খাকিদের প্রকাশ্য দৌরাত্ম্যের নিচে
গেরিলার আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাঁচি।’
কবি রবিউল হুসাইন, ষাট দশকের কবি হিসেবে চিহ্নিত হলেও তার কাব্যচর্চা সত্তর দশক হয়ে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রবহমান ছিল। কবি হিসেবে তিনিও পর্যবেক্ষণ করেছেন- পাকিস্তান শাসনামলে এই ভূখণ্ডের মানুষদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের সংগ্রাম, তাই তিনি তীব্র দেশপ্রেম থেকে বিবেকতাড়িত উচ্চারণ করেন- তার ‘প্রিয়তমা বাংলাদেশ’ নামে কবিতায়-
‘একদল হায়েনা- মানুষ আরেকদল স্বধর্মী মানুষের প্রতি
কী নির্মম নিষ্ঠুর এ-কথা ভুলে গেলে চলবে না
আত্ম-স্বাধীনতার পরিচয়ে উজ্জ্বল ও সত্য হয় ধর্মের সত্তা
একটি নতুন দেশের প্রসবকালীন এই ব্যথা এই জন্ম
মা সেই জননী মা সেই জন্মভূমি মহান
ব্যথায় কুঁকড়ে যায় মা আমার
আমরা তার বেদনার সন্তান’
৪০ দশক থেকে ৬০ দশকের কজন কবির কবিতা টেনে নিয়ে কিছু পঙ্ক্তি আলোতে নিয়ে আসা হলো মাত্র, যারা আজ বেঁচে নেই অথচ তাদের কবিতা বেঁচে আছে- আরও অনেক কবির কবিতা এখানে আলোচনা বা উচ্চকিত হওয়া গুরুত্বের সঙ্গে জরুরি ছিল, কিন্তু আলোচনার পরিসীমা নির্দিষ্ট রাখার প্রয়োজনে, এই আলোচনার সীমাবদ্ধতা থেকে গেল- অনালোচিত অন্যান্য কবির কবিতায়ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পরিধির অভিজ্ঞতা ও চৈতন্যের বহু বর্ণিল অনুভব পাওয়া যায়, পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের বহু বিস্তৃত অনুষঙ্গ ও চেতনা।