বাবা যখন বাড়ি ফিরলেন

আবু সাইদ কামাল

সাহিত্য

সেদিন আমার চোখে কোনো জল ছিল না, দুর্বহ এক দুঃসংবাদে হঠাৎ করে শোকের মাতম কিংবা কর”ণ বিলাপে হয় গাঁয়ের বাড়ি

2021-12-24T14:40:22+00:00
2021-12-24T14:40:22+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
বাবা যখন বাড়ি ফিরলেন
আবু সাইদ কামাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১, ২:৪০ পিএম 
সেদিন আমার চোখে কোনো জল ছিল না, দুর্বহ এক দুঃসংবাদে হঠাৎ করে শোকের মাতম কিংবা কর”ণ বিলাপে হয় গাঁয়ের বাড়ি মুহ্যমান আর স্তব্ধ ভোরের প্রকৃতিকেও করে তোলে শোকাবহ। বাবার চোখে স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি। তিনি বলতেন, উচ্চশিক্ষা নিয়ে ধরে রেখো স্বসংস্কৃতির শেকড়। তখন থেকেই আমি বাবার সেই স্বপ্নকে পরম যতেœ বুকের মাঝে লালন করি। পঁচিশ মার্চের কাল রাতের পরই দেশের নানা স্থানে হানাদার সেনাদের প্রতিরোধের প্রয়াস চলে। বাবাও তখন সেই প্রয়াসে নির্ভীক মুক্তিসেনা হয়ে ওঠেন। বাড়ির কাছে রেলসেতুর উত্তর পাশে সহযোদ্ধা কজন মিলে সুদৃঢ় এক অবস্থান নেয়। একদিন-দুদিন-তিন দিন ধরে ব্যাঙ্কারে রাত কাটে তাদের। আমি তখন কিশোর ছেলে, বাবার কাছে গিয়ে বলি, কখন বাড়ি যাবেন বাবা? 

কিছুক্ষণ কী যেন ভেবে গম্ভীর স্বরে বলেন, রবিবারে ভোরে হয়তো বাড়ি যেতে পারি। ফিরে গিয়ে বাবার কথা মাকে জানাই। শনিবারে গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনারা যখন সেতু পার হতে চায় অমনি প্রবল যুদ্ধ শুরু। সারারাত অবিরাম বুলেট বর্ষণ হয়। মাঝেমধ্যেই থেকে থেকে মর্টারশেলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এলাকা। আলোফোটা ভোরের আগে যুদ্ধ থামে। থমথমে সেই পরিবেশে কে যে হঠাৎ বাড়ি এসে ভোরের পাখির মতো গেয়ে ওঠে একটা করুণ সঙ্গীত! অমনি গ্রামের সেই বাড়িটা রোদন ঝড়ে মথিত হয়। 

ঘুমের মধ্যে ভয়াল রোদন ঝড়ের ঝাপটায় আমি শয্যা ছেড়ে হুড়মুড় করে উঠে বসি। আত্মখেদে মনে মনে বলি, গতকালও দৃঢ় আস্থায় তিনি বলেছিলেন, ভোরে বাড়ি ফিরবেন। আদর্শ বাবা তার কথা রক্ষা করলেন! গর্বিত সেই বাবার শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব নিয়ে যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন কি আর কাঁদতে পারি; নাকি এরূপ কান্না শোভন হবে! আমার দুচোখে তাই কোনো জল ছিল না।

দুই
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাবার শোকাবহ শেষ না হতেই হৃদয়স্পর্শী আরেক গল্পের সূচনা হয়। সেই যে খÐযুদ্ধ হলো, তার কদিন পর রেলসেতুর ওপার ঘেঁষে হানাদাররা গড়ে তোলে শক্তিশালী আস্তানা। সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে প্রতিরোধের সব প্রয়াসই। অরক্ষিত হয় সেতুপাশের গ্রাম এলাকা। সবাই যখন প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যায়, আমাদেরও ছাড়তে হলো ভিটেবাড়ি। এর মধ্যে এক বছরের কনিষ্ঠ ভাই ভীষণ সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়। ভয়াবহ জ্বরটা যখন বেড়েই চলে, তখন অসহায় মায়ের কান্নার আর্তি কে শোনে? 

ওষুধ আনতে গঞ্জে যাওয়ার উপায়ও নেই। উঠতি কিশোর বলে হায়েনাদের দৃষ্টিসীমায় যেতে দেন না মা আমাকে! দুদিন পর ভাইটির বুকে শ্বাসকষ্টেরা বাসা বাঁধে। কেউ কেউ বলে, নিউমোনিয়ার লক্ষণ। অবোধ ভাইটির জীবন রক্ষার জন্য শেষে ছেঁড়া-মলিন কাপড় পরে সাজলাম রাখাল ছেলে। ধুকপুক বুকে হানাদার সেনাদের ঘাঁটিঘেঁষা পথে হেঁটে গঞ্জে গেলাম। চিকিৎসককে রোগের লক্ষণ বলে জর”রি ওষুধ কিনলাম। ফেরার সময় বৃষ্টিভেজা কর্দমাক্ত পথে হাঁটছি এবং ভাবছি ভাইটির কথা। 

পরিবারের বড় সন্তান বলে কত দায়িত্ব মাথার ওপর! আমায় তখন তাড়া করছে ছোট্ট ভাইয়ের বুকের হাঁপর। যেন রাজ্যের বাতাস টানে নাকে-মুখে, সারা বুকে অক্সিজেনের অভাব। কখনও দ্রুত হেঁটে কিংবা কভু দৌড়ে গেলাম পাঁচ কিলো পথ। ভ্রুক্ষেপহীন যে এতটা পথ কেমন করে পাড়ি দিলাম, ঠিক মনে নেই। যখন দূরের আশ্রয়স্থলের কাছে গেলাম, আক্ষেপ করে এক স্বজন বলে, আহা বাপু! একটু আগেই ভাইটা তোমার...

ওই কথাটা শোনামাত্রই আকাশ ভেঙে পড়ল মাথার ওপর। বিষণœ মনে যখন বাড়ির আঙিনাতে পা ফেলেছি, তখন মায়ের বুকফাটা সেই আহাজারির ভগ্নাংশেরা আমার কানে হামলে পড়ে। গভীর দুঃখে নিয়তিকে তখন বলি, আর কতটা নির্দয় হয়ে কাঁদাতে চাও মাকে! একজন মানুষ কতটুকুই কাঁদতে পারে!

কদিন আগেই বৈধব্য করলেন বরণ, তার ওপর চিকিৎসাহীন প্রাণ হারাল কোলের শিশু। এ সময়ে ছেলে হয়ে কী প্রবোধ দিতে পারি তাকে! কী হারানোর বাকি রইল অসহায় মায়ের!

তিন
সহযোদ্ধা ছিলেন যারা, তাদের কেউবা বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম কিংবা বীরপ্রতীক খেতাব পেলেন। আমার বাবা সেসব কিছু না-ই বা পেলেন, তাতেও দুঃখ নেই আমাদের; কারণ তিনি পেয়েছেন সর্বোত্তম সেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সম্মান। দুঃখ আমার ওই জায়গাতে, যখন স্বসংস্কৃতি কিংবা নন্দনচর্চার মুক্ত আঙিনায় পরাজিত সেসব দৈত্যের প্রেতাত্মাদের উল্লম্ফন দেখি।



Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: