আড্ডা বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে। চণ্ডীমণ্ডপ থেকে শুরু করে আজকের ছোট ছোট ক্যাফেগুলো আড্ডার তীর্থস্থান। বাঙালি সাহিত্যিকদের জীবনে কিংবা বাংলা সাহিত্যে আড্ডার দৃশ্যপট আমরা অহরহই দেখি। বাংলা সাহিত্যের রবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাই বলি, ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সুরসিক। আড্ডায় সেই রস তিনি অহরহই বিতরণ করতেন। ছোট একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করি। কোনো এক মজলিসে রবিঠাকুর বসে আছেন। সেখানে উপস্থিত আছেন আরও বিদগ্ধব্যক্তিবর্গ। হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন, ‘এ ঘরে একটি বাঁদর আছে’।
সবাই তো মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। কবি কাকে বললেন এ কথা। কবি সবার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন। তার মুখে ফুটে উঠল স্মিতহাস্য। এবার বললেন, ‘এ ঘরে একটি বাঁ দোর আছে’। মানে কিনা ঘরের বাঁ দিকে একটি দরজা আছে। আড্ডার নানান চিত্র রবীন্দ্রনাথের নানান ছোটগল্পে, উপন্যাসেও ফুটে উঠেছে। ১৩৩৬ সালের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের কথাই ধরি। সেখানে অমিত রায় যে বলেছিল, ‘পুর”ষ আধিপত্য ছেড়ে দিলেই মেয়ে আধিপত্য শুরু করবে। দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ঙ্কর।’ সে তো আড্ডাতেই বলা। আড্ডা ছাড়া এমন বারুদের গোলা আর কোথায় নিক্ষিপ্ত হবে? কিংবা সাহিত্য সভার সভাপতি হয়ে অমিত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে বলেছিলেন, সেও তো এক ধরনের আড্ডাই। কেননা হালের গুরুগম্ভীর সাহিত্য সভায় সভাপতির বক্তৃতার মাঝখানে নিশ্চয় কেউ সভাপতিকে প্রশ্ন করেন না। সাহিত্য আড্ডা বলেই তা সম্ভব হয়েছিল।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও তুমুল আড্ডাবাজ হিসেবে পরিচিত। একবার এক বাড়িতে আড্ডায় বসে বলেছিলেন, আড্ডা দিতে হলে আগে ঘর থেকে দেয়ালঘড়ি সরাতে হবে। ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাস শরৎচন্দ্রের এক অমরসৃষ্টি। সেই শ্রীকান্তের ওপর শরৎচন্দ্রের চরিত্রের ছায়া পড়েছিল। তাই শরৎচন্দ্রের আড্ডাপ্রীতি শ্রীকান্তের মধ্যেও দেখা যায়। এ জন্যই ‘শ্রীকান্তে’র প্রথমপর্বে শ্রীকান্ত স্কুলবন্ধু রাজার ছেলের আমন্ত্রণে শিকার পার্টিতে গিয়ে উপস্থিত হয়। সেখানেই গানের মজলিসে দেখা হয় বাইজি পিয়ারী তথা রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে; যা উপন্যাসকে নিয়ে গেছে নতুন পথে।
কাজী নজরুল ইসলামের কথাসাহিত্যেও আমরা আড্ডার চিত্র দেখি। তার প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ গল্পে বাঙালি পল্টনের একটি ‘বওয়াটে যুবক’ আড্ডাতেই তার দুঃখের কাহিনি বিবৃত করেছেন। আড্ডা ছাড়া সেই কাহিনি বলার মতো পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হতো না। ‘শিউলী মালা’ গল্পে, যা কাজী নজরুল ইসলামের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর একটি, সেখানে আজহার এবং শিউলীর প্রেমের কাহিনি বলার জন্য গল্পের শুরুতেই আড্ডার অবতারণা করেছেন লেখক। গল্পের শুরুর প্রথম তিন পৃষ্ঠায় কাজী নজরুল ইসলাম আজহারের বাড়িতে আড্ডার চিত্র এঁকেছেন; যা যথার্থই আড্ডার প্রতিচ্ছবি। দাবার আসরে গান হচ্ছে। চলতি ঘটনা নিয়ে আলাপ হচ্ছে। চটুল কথাবার্তা হচ্ছে। আড্ডা তো এমনই হয়- লাগাম ছাড়া যার গতি।
বাংলা ছোটগল্পে-উপন্যাসে আড্ডার নানান চিত্র আমরা দেখি। মণ্ডপের আড্ডা, পারিবারিক আড্ডা প্রভৃতি। তবে আন্তর্জাতিক আড্ডার কথা আমরা সম্ভবত সৈয়দ মুজতবা আলীতেই পাই। বলা বাহুল্য আড্ডাবাজ হিসেবে সৈয়দ মুজতবা আলীও ছিলেন সুপরিচিত। তার পাণ্ডিত্য এবং রসবোধ যেকোনো আড্ডাকেই করে তুলত প্রাণবন্ত। সৈয়দ নিজেই বলেছেন, ‘বাঙলা দেশের তাবৎ চণ্ডিমণ্ডপ, বেবাক জমিদার-হাবেলীর আড্ডার প্রতিভূ হিসেবে আপনাদের আশীর্বাদে আর শ্রীগুরুর কৃপায় ধূলির ধূলি এ-অধম।’ ‘আড্ডা’ প্রবন্ধেই সৈয়দ মুজতবা আলী কায়রোতে তার আড্ডার সঙ্গীদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে, ‘আমাদের আড্ডা বসত কাফের উত্তর পূর্ব কোণে, কাউন্টারের গা ঘেঁষে। হরেক জাতের চিড়িয়া সে আড্ডায় হরবকৎ মৌজুত থাকত। রমজান বে আর সজ্জাদ এফেন্দি খাঁটি মিশরী মুসলমান, ওয়াহহাব আতিয়া কপ্ট ক্রীশ্চান অর্থাৎ ততোধিক খাঁটি মিশরী, কারণ তার শরীরে রয়েছে ফারাওদের রক্ত। জুর্নো ফরাসী কিন্তু কুপুরুষ ধরে ‘কাইরোর হাওয়া বিষাক্ত করছে’ কেউ জানে না... মার্কোস জাতে গ্রীক, বেশী নয় কুল্লে আড়াই হাজার বছর ধরে তারা মিশরে আছে। মিশর রাণী, গ্রীক রমণী ক্লিয়োপাত্রার সঙ্গে তার নাকি খেশকুটুম্বিতা আছে।’ আসলে আড্ডা শুধু বাঙালি নয়, সারা পৃথিবীর মানুষের রক্তেই মিশে আছে। তবু বলতে ইচ্ছে করে, বাঙালির রক্তে বোধহয় এর মাত্রা একটু বেশিই।
/আরএ