বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। পৃথিবীর অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের অধিকারী হতে পারেনি। অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেও পায়নি কাক্সিক্ষত মুক্তির স্বাদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো ক্যারিশমাটিক নেতার নেতৃত্বগুণে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালিরা অর্জন করেছে তাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। যতদিন বাঙালি জাতিগোষ্ঠী থাকবে ততদিন অনিবার্যভাবে পাঠ করতে হবে তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে।
বর্তমানে বাংলাদেশ উদযাপন করছে তার সুবর্ণজয়ন্তী। একই সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ‘মুজিববর্ষ’। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসংখ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যে গ্রন্থগুলো ব্যতীত বাংলাদেশ বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের চর্চা থাকবে অসম্পূর্ণ। আজ আমরা এরকম চারটি অনিবার্য গ্রন্থ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করার প্রয়াস চালাব-
অসমাপ্ত আত্মজীবনী
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনন্য অসাধারণ কাজ অসমাপ্ত আত্মজীবনী। বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক এই বই। একজন নেতার বেড়ে ওঠা, রাজনীতি, দেশপ্রেম জনগণের প্রতি ভালোবাসার এক অনুপম দলিল এই গ্রন্থ। বঙ্গবন্ধু হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। এ কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না বঙ্গবন্ধুর জীবনীবিহীন বাংলাদেশ পাঠটি অসম্পূর্ণ। সুতরাং বাংলাদেশকে ও বাঙালিকে জানতে হলে অনিবার্যভাবে অবশ্যম্ভাবী পাঠ্য জাতির পিতার অনন্য অসাধারণ সৃষ্টি অসমাপ্ত আত্মজীবনী।
চরমপত্র
বাংলাদেশের বাঙালির জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় তার মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য দলিল এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্র। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত চরমপত্র ছিল অবরুদ্ধ বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের বাঙালির অন্যতম অনুপ্রেরণার অনুষ্ঠান। একটি অনুষ্ঠান, একটি কথিকা কীভাবে সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করে রাখে, আশার বাতি জ¦ালিয়ে রাখে, চূড়ান্ত প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে যেতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ চরমপত্র। ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের তাঁবেদারদের ব্যঙ্গোক্তি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার বিবরণ বা কথকতা এই চরমপত্র।
একাত্তরের দিনগুলি
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের অনবদ্য সৃষ্টি একাত্তরের দিনগুলি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অবরুদ্ধ ঢাকার অনুপম চিত্র পাওয়া যায় বইটিতে। একদিকে প্রচণ্ড নিপীড়ন, ভয়াবহ অবস্থা অপরদিকে স্বাধীনতা সূর্যের আকাক্সক্ষায় প্রত্যাশারত বাঙালি বাংলাদেশের মানুষের এক নিপুণ চিত্র ধারণ করেছে বইটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কিশোরী আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি আমাদের কাছে জীবন্ত করে রেখেছে সে সময়ের আনা ফ্রাঙ্কের শহরকে। বিশ্বজুড়ে আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির ভেতর দিয়ে জীবন্ত তার স্মৃতি, জীবন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলোও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অবরুদ্ধ ঢাকার জীবন্ত ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আনা ফ্রাঙ্ক ছিলেন কিশোরী আর আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাহানারা ইমাম একজন পূর্ণ মানুষ। দুই সন্তান রুমী-জামী ও স্বামী শরীফ ইমামকে নিয়ে তার সুখের সংসার। তেমনি জাহানারা ইমামের জীবনকেও উলটপালট করে দিয়েছে। যুদ্ধে অবরুদ্ধ ঢাকাতেই তার চোখের সামনে নিজ বাড়ি থেকে স্বামী শরীফ ইমাম ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান রুমীকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। স্বামী শরীফ ইমাম পাকিস্তানি নির্যাতন সহ্য করে ফিরে এলেও মূলত সে নির্যাতনেই চূড়ান্ত বিজয়ের আগে মারা যান। সন্তান রুমী পাকিস্তানি হায়েনাদের হাতে বাংলার অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার মতো শহীদ হয়ে যান। একাত্তরের দিনগুলিতেও জাহানারা ইমাম তার পরিবার, ঢাকার গেরিলা যুদ্ধ, স্বামী শরীফ ইমাম, সন্তান রুমী-জামী, রুমীর মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের মধ্য দিয়ে জীবন্তভাবে তুলে ধরেছেন একাত্তরের ঢাকাকে। ভবিষ্যতেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত নাটক, সিনেমা ও উপন্যাস লেখা হবে তার অন্যতম গ্রন্থ হতে পারে একাত্তরের দিনগুলি।
গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অন্যতম দলিল গেরিলা যোদ্ধা মাহবুব আলমের দুখণ্ডে লেখা গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে গ্রন্থটি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সব বিচারেই মহাকাব্যিক। ইতিহাসে মহাকাব্যিক বিষয়ে নানা মাত্রার লেখা সংযোজিত হয়। ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, প্রান্তজনের ভূমিকা, অবস্থান- সব কিছুই মহাকাব্যের উপাদান। মহাকাব্যকে ধারণ করা ঘটনার সব দিক নিয়েই রচিত হয় আলাদা আলাদা মহাকাব্য। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে উঠে আসে ইতিহাস, সমাজ বাস্তবতা। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ।
যদিও সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে হয়তো তেমন বড় কোনো সংখ্যা নয়। তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় ১৯৭১ সাল নিয়ে উপন্যাস, ইতিহাস, স্মৃতিকথা, সরাসরি যুদ্ধের বিবরণ, মুজিবনগর সরকার, অবরুদ্ধ ঢাকাসহ নানাদিক নিয়ে কয়েকটি মহাকাব্যিক গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে ধারণ করা হয়েছে সময়, রাজনীতি, প্রেক্ষাপট, জনগণের সংগ্রামসহ পুরো অধ্যায়কে। এ প্রেক্ষাপটে ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’ মুক্তিযুদ্ধে জনযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে মহাকাব্যিকভাবে ধারণ করা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
বাঙালি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম এই চারটি গ্রন্থ অনিবার্যভাবে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা জোগাবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে। প্রেরণা জোগাবে অনাগত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। বাংলাদেশ বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জানতে অবশ্য পাঠ্যগ্রন্থ চারটি। যেকোনো বিচারে এই আকর অনিবার্য গ্রন্থগুলোর কোনো বিকল্প নেই।
/আরএ