‘টেস্টিমনি অব সিক্সটি’ টেস্টিমনি অব সিক্সটি- ষাটজনের সাক্ষ্য। কোন ৬০ জন? যারা একাত্তরে বাংলাদেশের ভয়াবহতা দেখেছেন, যারা এই ভয়াবহ বর্ণনাতীত পরিস্থিতিতে বসবাস করছেন, তাদের সাক্ষ্য। এই স্বর তাদেরই স্বর। সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে আছেন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি ও মাদার তেরেসা। বরেণ্য সাংবাদিকদের মধ্যে আছেন জন পিলজার, মাইকেল ব্র্যানসন, ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ, নিকোলাস টোমালিন, মার্টিন উলাকট, এলেক্স হেনড্রি, অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস, ডেভিড লোসাক, অ্যালান হার্ট, ক্লদ মস প্রমুখ। সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন জন স্টোনহাউস, বার্নার্ড ব্রেইন, জেমস রামসডেন, ব্রুস ডগলাস-মান প্রমুখ।
এসব লোকের কাছে দৌড়ে দৌড়ে যাওয়া হলো। সংগ্রহ করা হলো তাদের সাক্ষ্য ও বিশ্ববাসীর প্রতি তাদের আবেদন। সবাই লেখার হাত বাড়িয়ে দিলেন। বরেণ্য চিত্রগ্রাহকরা তাদের দুর্লভ ছবি পাঠালেন। শিল্পী জেরার্ড স্কার্ফ লেখা না পাঠিয়ে পাঠালেন কয়েকটি স্কেচ। সব মিলিয়ে দাঁড়িয়ে গেল অসাধারণ এক প্রকাশনা।
সে সময় অক্সফামের পরিচালক ছিলেন লেসলি কার্কলে। এই দুর্লভ ও মানবিক প্রকাশনাটির মুখবন্ধ লিখেছেন তিনি। কার্কলে লিখছেন, এই গল্প তাড়া-খাওয়া, গৃহহারা, মৃত্যু-উন্মুখ মানুষের। যখন এ-প্রান্তে মহাপ্রলয়, বিশ্বসম্প্রদায় উটপাখির মতো মাথা গুঁজে রাখার খেলায় ব্যস্ত।
১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হলো ইতিহাসের অসামান্য এক দলিল। ততদিনে অক্সফাম পরিচালকের ভাষায় সুইডেন ও নিউজিল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার সমসংখ্যক মানুষ স্বদেশ ছেড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে। এই দলিল প্রকাশের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন চলাকালে বিতরণ করা। উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।
এই প্রকাশনা বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে। নাড়া দেওয়ার কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলেন সিনেটর কেনেডি। তিনি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের শরণার্থী বিষয়ক সিনেট উপকমিটির চেয়ারম্যান। একাত্তরের ভারতের সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন, শত শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলেন কেনেডি। এই সাক্ষ্য দলিলে তিনি ‘দুর্দশার মোজাইক’ নামে একটি লেখা লেখেন। সেখানে জোর দিয়ে বলেন, এই ট্র্যাজেডির ব্যাপকতা পৃথিবী বুঝে উঠতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘পূর্ব বাংলার ট্র্যাজেডি কেবল পাকিস্তানের জন্য ট্র্যাজেডি নয়, এটা কেবল ভারতের জন্য ট্র্যাজেডি নয়, এটা সমগ্র বিশ্বসম্প্রদায়ের জন্য ট্র্যাজেডি।’
এটুকু বলে কাজ শেষ মনে করেননি কেনেডি। তারই প্রস্তাব অনুযায়ী এই দলিলটি বাঙালি স্বাধীনতার সাক্ষ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ৯২তম কংগ্রেসের কার্যক্রমে রেকর্ডভুক্ত হয়। এমনি করেই একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বকে পরিচিত করে দিয়েছেন অসামান্য কিছু মানুষ। নিশ্চয়ই এসব উদ্যোগ কোনো না কোনোভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে।
‘হোয়াইট পেপার অন দ্য ক্রাইসিস অব ইস্ট পাকিস্তান’
আন্তর্জাতিক প্রেস ঘটনাপ্রবাহের যে বিবরণ প্রকাশ করেছিল, তাতে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি ক্রমেই মলিন হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় ৫ আগস্ট ১৯৭১ পাকিস্তান সরকার ‘পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্কট’ শিরোনামে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। শ্বেতপত্রের ভূমিকায় বলা হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল একপেশে তথ্যাবলি পেয়ে আসছে এবং অসম্পূর্ণ ও প্রভাবিত বিশ্লেষণ তাদের পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করছে। প্রকৃত ও সম্পূর্ণ তথ্য তাদের জানা নেই। পাকিস্তানের তথ্য ও জাতীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক মহলসহ সবাইকে প্রকৃত সত্য (?) জানানোর জন্য পূর্ব পাকিস্তান সঙ্কটের মূল কারণ অনুসন্ধানে লিপ্ত হয় এবং সঙ্কটের মূল কারণ হিসেবে জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতাকে দায়ী করে। পাকিস্তানের অখণ্ডতা বিপন্ন করার লক্ষ্যে যে সশস্ত্র বিদ্রোহ পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয়েছে তার মুখোশ উন্মোচনের দায়িত্ব নেয় তথ্য মন্ত্রণালয়। শ্বেতপত্রে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের স্বায়ত্তশাসন দাবিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে দেখিয়ে সঙ্কটের জন্য আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়ী করা হয়েছে।
এ নিবন্ধ মূলত পাকিস্তানি শ্বেতপত্রের একটি অধ্যায়ের ভাষান্তর কোথাও ভাবানুবাদ, কোথাও বা সরাসরি। শ্বেতপত্রে বাংলাদেশ, স্বাধীনতা যুদ্ধ, আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিভিন্নভাবে কটাক্ষ করা হয়েছে। শ্বেতপত্রে পাকিস্তান সরকারের ভাষ্য লিপিবদ্ধ হলেও তাতে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বের প্রশ্নের সহজ ও স্বচ্ছ জবাব বিধৃত। লেখাটি স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসু পাঠক ও গবেষকের কিছুটা কাজে লাগতে পারে। টাইম পত্রিকার সংবাদদাতা ড্যান কোগিনকে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, পাকিস্তান শেষ হয়ে গেছে। ফয়সালার আর কোনো আশা নেই। তখনই মনে হচ্ছিল এই নেতা সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে।
এর আগে বিলেতের ডেইলি টেলিগ্রাফ লিখেছে, শেখ মুজিবুর রহমানের দাবিনামার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা সূক্ষ্মভাবে লুকিয়ে আছে।