মানহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রমরমা ব্যবসা

মোখলেছুর রহমান ধনু, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর

সারাদেশ

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা। মেঘনার ভাঙনে এ উপজেলার এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। দেশের সবচেয়ে ছোট উপজেলা এটি। এ

2025-01-03T04:15:08+00:00
2025-01-03T04:15:08+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
মানহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রমরমা ব্যবসা
মোখলেছুর রহমান ধনু, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৫, ৪:১৫ এএম 
মানহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রমরমা ব্যবসা
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা। মেঘনার ভাঙনে এ উপজেলার এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। দেশের সবচেয়ে ছোট উপজেলা এটি। এ অঞ্চলের মানুষ নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সহায়-সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চরাঞ্চলের এসব সহজ-সরল মানুষগুলোকে ভুলভাল বুঝিয়ে একশ্রেণির লোক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে। ছোট এ উপজেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ১৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। 
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনেই রয়েছে ৮টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নাকের ডগায় মানহীন এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চলছে রমরমা ব্যবসা। সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একশ্রেণির অসাধু প্রভাবশালী।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সোহেল রানা সরকারি হাসপাতালে ঠিকমতো ডিউটি না করে হাই কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের মানহীন প্রতিষ্ঠানে বসে রোগী দেখেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. সোহেল রানা বলেন, আমি তো হাই কেয়ারের মালিক নই। হাই কেয়ার কোনো অনিয়ম করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আপনারা লেখেন, আমার কোনো অসুবিধা নেই।

বিসমিল্লাহ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, আমরা স্বাস্থ্য অধিদফতরের সব নীতিমালা মেনেই ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা করছি।

লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক হারুন অর রশিদ পাঠান বলেন, কমলনগর উপজেলার ১৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে মাত্র দুটিকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোকে পরিবেশ অধিদফতর কোনো ছাড়পত্র দেয়নি।

শ্রম অধিদফতরের উপমহাপরিদর্শক প্রকৌশলী শরীফ আহাম্মেদ আজাদ বলেন, এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অধীনে থাকা শ্রমিকদের স্বার্থগুলো মূলত আমরা দেখাশোনা করি।

কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. কাজী একরামুল হক বলেন, রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নবিহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ রাখার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা রয়েছে। যারা স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ম্যানেজ করে চলার বিষয়টি সত্য নয়।

লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. আহাম্মদ কবীর বলেন, এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার জন্য আমরা জেলা প্রশাসনের কাছে তালিকা প্রেরণ করেছি। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে মনিটরিং করছি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন করইতলা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ছোটবড় ১৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরা চিকিৎসাসেবার নামে দরিদ্র ও সহজ-সরল মানুষকে জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরা ওপর মহলকে খুশি রেখে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই তাদের রমরমা চিকিৎসা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান তেমন কোনো পদক্ষেপ না থাকায় চিকিৎসাসেবার নামে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী মানুষ ঠকানোর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স এবং অদক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই ভালোমানের ডাক্তার। নেই স্বাস্থ্য বিভাগের লাইসেন্স, শ্রম অধিদফতর, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র। প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ নীরব থাকায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যসেবার নামে কমলনগরে চলছে এক প্রতারণার ফাঁদ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর প্রত্যয়নপত্র, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন নম্বর, পরিবেশ অধিদফর, ফায়ার সার্ভিস ও শ্রম অধিদফতরের ছাড়পত্র, নারকোটিক পারমিট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চুক্তিপত্রসহ বেশ কিছু কাগজপত্র ও অবকাঠামোগত বিষয় থাকতে হয়। এ ছাড়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন টেকনোলজিস্ট ও দুজন টেকনিশিয়ান থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কমলনগর উপজেলায় এসব কিছুই নেই। শুধু একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়ে অদক্ষ কিছু লোকজন বসিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলায় বেশিরভাগ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই কোনো মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। নামমাত্র টেকনিশিয়ান দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা। কিছু কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ল্যাব পিয়ন, আয়া ও বাবুর্চি দিয়ে এক্সরে, ইসিজি ও রক্ত সংগ্রহের কাজ করা হচ্ছে। অথচ তাদের নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে গড়ে ওঠা ৮টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে হাই কেয়ার নামের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই রেডিওগ্রাফার। ন্যূনতম প্রশিক্ষণ নেই এমন লোক দিয়ে নানা জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার করইতলা বাজারে হাই কেয়ার, লাইফ লাইন, নিউ উপকূল, ইনসাফ, গাইনি কেয়ার, দেশ মা মাটি, উপকূল, ফজুমিয়ার হাটে গ্রিন লাইফ, নিরাময়, মা ডিজিটাল, করুনানগর বাজারে আজাদ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাজিরহাট বাজারে বিসমিল্লাহ-১, বিসমিল্লাহ-২, নিউ মেঘনাসহ উপজেলায় মোট ১৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে নিউ মেঘনা ও বিসমিল্লাহ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কোনো অনুমোদন নেই। বাকিগুলোর অনুমোদন থাকলেও অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়ে কোনোরকমে চিকিৎসাসবার মতো গুরুত্বপূর্ণ এ সেক্টর চালাচ্ছে। এর জন্য স্বাস্থ্য প্রশাসনের অবহেলা আর অবৈধ লেনদেনকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।

সময়ের আলো/আরএস/


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: