রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের ভূমিহীন কৃষক ইসমাইল হক। এবার শীতের সবজি চাষ করবেন এ আশায় ৮০ হাজার টাকায় পালিত গরু বিক্রি করেন। ৪১ শতাংশ জমি ইজারা নিয়ে সেই টাকা টমেটোর জন্য বিনিয়োগ করেন। কিন্তু বাজারে শীতকালীন সবজির দাম হঠাৎ নিম্নমুখী হয়ে পড়ায় ভাঙে ইসমাইলের লাভের আশা। তার উৎপাদিত টমেটোর ক্ষতির আশঙ্কাও করছেন তিনি।
কৃষক ইসমাইল হক বলেন, আমি ৪১ শতাংশ জমি ইজারা নিয়ে টমেটো চাষ করেছি। কিন্তু দাম একেবারে কমে গেছে। যা টমেটো ছিল তা বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়েছে। এতে আমার উৎপাদন খরচই উঠেনি। জমি থেকে প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ৫ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে এই দর আরও কমেছে। এখন মাটির টমেটো গাছ কেটে মাটির নিচে পুঁতে রেখেছি। কিন্তু জীবন তো চালিয়ে নিতে হবে। তাই এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একটি বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার কথা ভাবছি।
ইসমাইলের মতো উত্তরাঞ্চলের কয়েক হাজার কৃষক এবার শীতকালীন ফসলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। জমিতে টমেটো, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা ও পেঁয়াজের মতো শীতকালীন সবজিতে বিনিয়োগ করেছিলেন তারা। কিন্তু দরপতনের বাহুল্যে উৎপাদন খরচ তুলতেই বেগ পেতে হচ্ছে কৃষককে। রাজশাহীর বিভিন্ন বাজারে ১০-৪০ টাকা কেজির মধ্যে সব সবজি বিক্রি হচ্ছে।
কৃষকরা বলছেন, উৎপাদিত ফসলের দাম এবার অনেক কম। আর অন্য মৌসুমের তুলনায় এই মৌসুমে উৎপাদন খরচও বেড়েছে ৫০ শতাংশের মতো। এ ছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে আরও দাম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন কৃষকরা।
তানোর উপজেলার আলুচাষি মঞ্জুর রহমান বলেন, কৃষক পর্যায়ে আলুর দাম ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে ২০-২২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া আলু এখন ১৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যদিও উৎপাদন খরচ ৩৫ টাকা কেজি ছাড়িয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করা ছেড়ে দেবে।
পবা উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের আরিফও হতাশা প্রকাশ করেন। গেল মৌসুমে তিনি দুই বিঘা জমিতে বেগুন ও শিম চাষ করে ৫০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। কিন্তু এই বছরের তিনি উল্টো ৩০ হাজার টাকার লোকসান করেছেন। দুঃখ প্রকাশ করে আরিফ বলেন, এই বছর দাম কমে যাওয়ার কারণে আমার উৎপাদন খরচও মেটাতে পারব না। সেখানে লাভের আশা দূরে থাকল।
হরিয়ানের শওকত মণ্ডল ফুলকপির দাম না পাওয়ায় ফসল নষ্ট করে ফেলেছেন। তার এলাকা থেকে খড়খড়ি বাজারে সবজির মোকামে এক মণের পরিবহন খরচ পড়েছে ৮০ টাকা। কিন্তু সেখানে তিনি এক মণ ফুলকপির দাম পেয়েছেন ৬০ টাকা। তিনি বলেন, যদি উৎপাদন খরচই না ওঠে তা হলে তো আমার কিছুই থাকে না। শুধু শুধু ফুলকপির জন্য আমাকে কষ্ট করতে হয়েছে। এজন্য আমি ফুলকপির সব গাছ কেটে ফেলেছি।
গোদাগাড়ী উপজেলার দেওয়ানপাড়া গ্রামের কৃষক আফজাল আহমেদ বলেন, ৫৩ শতাংশ জমি ইজারা নিয়ে টমেটো চাষ করেছি। সব মিলিয়ে চাষে খরচ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো। কিন্তু টমেটো বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪৫ হাজার টাকায়।
রাজশাহীর অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি সবজির বাজার খড়খড়ি। এই বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ফুলকপি ৩ থেকে ৫ টাকা কেজি, মুলা ২ টাকা কেজি, বাঁধাকপি ১০ টাকা কেজি, বেগুন ১০-১৫ টাকা কেজি, টমেটো ও আলু ১৩-১৫ টাকা কেজি, শিম ১৫ টাকা কেজি এবং পেঁয়াজ ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু শহরের বাজারগুলোতেও ১০-৪০ টাকার মধ্যে সব সবজি পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যে দেখা গেছে, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ এই চার জেলায় শীতকালীন ফসলের আবাদ এই মৌসুমে হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছর যেখানে ৪০ হাজার ৭০৮ হেক্টর জমি ছিল। এ বছর ৩৯ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে শীতকালীন ফসলের আবাদ করা হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক মোতালেব হোসেন বলেন, পরিস্থিতিটা বিভ্রান্তিকর। শীতকালীন ফসলের দামের পতন অপ্রত্যাশিত। আমরা এর সঠিক কারণ চিহ্নিত করতে পারছি না।
মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যস্থতাকারী, সরকারি তদারকি, কৃষকবান্ধব নীতি, পচনশীল ফসলের জন্য যথাযথ সংরক্ষণের সুবিধার অভাবসহ বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, সরকারকে ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করতে হবে। বাজার সংযোগও উন্নত করতে হবে। শীতকালীন সবজির জন্য হিমাগার স্থাপন করতে পারলে কোনো কৃষক হতাশ হবে না। কৃষকদের সাশ্রয়ী মূল্যে ঋণ প্রদানের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যর্থতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
সময়ের আলো/আরএস/