ঢাকার অদূরে ধামরাই উপজেলায় ইটভাটার কশাঘাতে একদিকে বিপন্ন পরিবেশ, অন্যদিকে ঝুঁকিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও বিভিন্ন দূষিত পদার্থ বাতাসে মিশে গিয়ে একদিকে আশপাশের অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করছে, অন্যদিকে পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইকো সিস্টেমের গাছপালা ও প্রাণিকুলের ওপর। যেসব পোকামাকড় পরাগায়ন ঘটায় তাদের নানাভাবে বাধা দিচ্ছে দূষিত ধোঁয়া ও ধোঁয়ায় মিশে থাকা নানা বিষাক্ত উপাদান।
ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া তাদের অবস্থানকে নাজুক করে দেয়। ফলে ইকো সিস্টেমের যে চেইন রয়েছে সেটা নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে রাতের আঁধারে কাটা হচ্ছে ফসলি জমির মাটি। সেই মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়। মাটিবাহী ভারী ট্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক, ধুলায় আচ্ছন্ন থাকছে পরিবেশ। এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চান এলাকাবাসী। তাদের মতে, প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা ও ঢাকার নিকটবর্তী এলাকাটির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ইটভাটার লাগাম টানা জরুরি। আর পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক জামাল উদ্দিন রুনু বলেন, সাভার ও ধামরাই অঞ্চলে অনেক ইটভাটা রয়েছে। আইনগত ভিত্তি না থাকার পরও ইটভাটাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। অবশ্য এর সংগত কারণও রয়েছে। কারণ ইটের ব্যাপক চাহিদা আছে। ইটের বিকল্প না থাকায় এর চাহিদা বাজারে অপরিসীম। কিন্তু ইটভাটা কীভাবে পরিবেশ দূষিত করছে তা নিয়ে ভাবতে হবে। প্রথমত ইটভাটার চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ার সঙ্গে বাতাসে পরিবেশে কয়েকটি জিনিস ছড়াচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে নক্স, নাইট্রো অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, এসপিএম অথবা পিএম ২.৫ ও পিএম ১০। এ ছাড়া ভলাটেল অর্গানিক মেটাল হিসেবে ভক আর কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড তো আছেই।
এ ছাড়া ভাটার দূষিত ধোঁয়া মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করছে। সরাসরি ২.৫ এবং পিএম ১০ ইনহেল করে মানুষ শ্বাসজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড অথবা নক্স সক্স এগুলো গ্রিন হাউস গ্যাস হিসেবে আমাদের শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। ফলে মাইক্রো ক্লাইমেট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সামগ্রিক জলবায়ুতেও পরিবর্তন ঘটছে। আমি মনে করি, ইটভাটার লাগামহীন পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হই আইনের মধ্য দিয়ে তা হলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির পাশাপাশি পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটবে। এখনই উচিত ইটের বিকল্প পণ্য বাজারে ছাড়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা। প্রণোদনা দিয়ে কিংবা আইনগতভাবে বাধ্য করে এসব কর্মকাণ্ডের লাগাম টানতে হবে। অন্যথায় আইন ও অনুশাসনকে ফাঁকি দিয়ে ইটভাটা এভাবেই চলতে থাকবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী গত কয়েক মাসে অর্ধশতাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অনেক অবৈধ ইটভাটা ধ্বংস করা হচ্ছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামনুন আহমেদ অনীক বলেন, ধামরাইয়ে প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে মাটি কাটার হিড়িক পড়ে যায়। কারণ এখানে প্রচুর ইটভাটা রয়েছে। এখানকার মাটিও ইট বানানোর যন্য যথোপযুক্ত। ফলে চাহিদা বেশি। এতে প্রচুর ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। আমরা গত দুই মাসে ৩০টিরও বেশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছি। ভেকু জব্দ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আহমেদুল হক তিতাস বলেন, ইটভাটার কালো ধোঁয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই কালো ধোঁয়া থেকে রোগীদের শ্বাসকষ্ট হয়, নিউমোনিয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকিও থাকে। রাস্তাঘাটে প্রচুর ধুলাবালি। বর্তমানে শ্বাসকষ্ট, আ্যালার্জি ও হাঁপানির প্রচুর রোগী পাচ্ছি। যাদের আগে হাঁপানি ছিল না, নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের খেয়াল রাখা দরকার, যাতে ভাটার কালো ধোঁয়া কারও ক্ষতি না করতে পারে।
ধামরাইয়ের বালিথা এলাকার কৃষক শামসুল হক বলেন, একসময় সবই আবাদি জমি ছিল। ২-৩ বার ফসল ফলাতাম। ইটভাটা কোম্পানি এসে সব জমি নষ্ট করছে। সব মাটি ইটভাটা গিলেছে। জমি এখন খাল হয়ে গেছে। এমনভাবে জমির মাটি কাটে যে, পাশের জমির মালিকও বাধ্য হয় কাটতে। কারণ অতিরিক্ত খাদ করায় পাশের জমি এমনিতেই ভেঙে পড়তে থাকে। আরেক কৃষক লাল মিয়া বলেন, ২-৩ ফসলি জমিগুলোর মাটি কেটে নিয়ে গেছে ইটভাটায়। ভাটায় মাটির পাহাড়, কিন্তু কৃষিজমি এখন খাল। এগুলোয় কিছু করা যায় না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে ধামরাই একসময় খালে পরিণত হবে।
কুশুরা এলাকার বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সড়কে ইট ও মাটি বহনকারী বড় বড় ট্রাক চলায় আমাদের খুব অসুবিধা হয়। মসজিদে আসতে পারি না, হাটবাজারে যাতায়াতেও খুবই সমস্যা হয়। জনগণ খুব কষ্টে আছে। ঘরবাড়ির ক্ষতি হচ্ছে ধুলায়। ঘরের টিন নষ্ট হচ্ছে, গাছগাছালি নষ্ট হচ্ছে। ফসলের ফলন ভালো হয় না।
ভ্যানচালক আবুল হোসেন বলেন, ধুলার কারণে সর্দি-কাশি লেগেই থাকে। জমিতে শাকসবজি টেকে না। বৃষ্টি হলে রাস্তা কাদায় ভর্তি থাকে। আবার শুকনার সময় ধুলা। জীবন একদম শেষ হয়ে গেছে। সবার বাড়িঘরে ধুলা। এই পরিণতি থেকে মুক্তি চাই।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, ধামরাইয়ে দেড় শতাধিক ইটভাটা রয়েছে যার সিংহভাগই অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ইটভাটার কাঁচামাল কৃষিজমির টপ সয়েল। এ জন্য কৃষকদের বাধ্য করা হচ্ছে মাটি বিক্রিতে। ফসলি জমি রাতারাতি পরিণত হচ্ছে খালে। কমছে চাষের আবাদি জমি। গত দুই মাসে ৩০টিরও বেশি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ভেঙে দেওয়া হয়েছে চিমনি, করা হয়েছে আর্থিক জরিমানা। কিন্তু কোনোভাবেই থামছে না ভাটার পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড।
সরেজমিন ধামরাই উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের ফসলি মাঠে দেখা যায়, রাত নেমে আসার পরপরই ভাটার নিকটবর্তী এলাকাগুলোর ফসলি জমির পাশে ভিড়তে শুরু করে বড় বড় ট্রাকের বহর। দিনের আলো নিভতেই শুরু হয় মাটি কাটা।
বছরের পর বছরজুড়ে বেআইনিভাবে এভাবেই ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকার মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে। ভাটায় জমছে মাটির পাহাড়। আর প্রতিনিয়ত ছোট ছোট ডোবা-খালের অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে উপজেলাটি। এসব মাটি পরিবহনে বড় ট্রাকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক। ধুলায় আচ্ছন্ন থাকছে আশপাশের পুরো এলাকা। ধুলা আর ভাটার দূষিত ধোঁয়ায় বাড়ছে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের প্রকোপ। ভাটার মাটি পরিবহনে ব্যবহার করা ভারী ট্রাকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় সড়কগুলো। চলাচলে ভোগান্তি পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষ।