নওগাঁর রানীনগর উপজেলায় পারইল ইউনিয়নের পারইল গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান হবিবর রহমানের ছেলে মতিউর সম্প্রতি দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। ট্রেনের নিচে পড়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে আছেন তিনি। অনেকেই বলছেন, তাকে আল্লাহ নিজ হাতে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২০ মে) সকালে মতিউরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় উৎসুক জনতার ভিড়। এ সময় কথা হয় মতিউরসহ তার পরিবারের সঙ্গে।
মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যরা জানান, মতিউর ৪০ দিন আগে বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার তালশন গ্রামের হেলাল প্রামাণিকের ছেলে সজীব প্রামাণিককে (৩২) নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। সেখানে চাকরি দেরিতে হওয়ায় ও বৈধ কাগজ না পাওয়ায় সজীবের স্বজনরা চোরের অপবাদ দিয়ে মতিউরকে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। এ ঘটনায় সজীবের শ্যালক সুমনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৬-৭ জনকে আসামি করে সান্তাহার রেলওয়ে থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে সজীবের বাবার দাবি, তাদের কেউ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত না।
এ বিষয়ে সান্তাহার রেলওয়ে থানার ওসি হাবিবুর রহমান অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অভিযোগ পাওয়া মাত্রই মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে এবং যার নামে অভিযোগ দিয়েছে তাকে ধরার জন্য অভিযান শুরু করা হয়েছে। এ ছাড়া মূল ঘটনা উদঘাটনের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।
পারইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদুর রহমান বলেন, হয়তো সে দুয়েকজনকে বিদেশে পাঠাতে ব্যর্থ হতে পারে। তবে সে চোর বা ছিনতাইকারী না। তাই তার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে সেটির সঠিক কারণ উদঘাটন করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।
বিদেশ থেকে মোবাইল ফোনে অভিযুক্ত সজীবের বাবা হেলাল প্রামাণিক বলেন, আমার ছেলেকে মতিউর প্রায় এক মাস ১০ দিন আগে কোম্পানির ভিসায় বিদেশ পাঠায়। কিন্তু পরে জানা যাচ্ছে সাপ্লাই ভিসায়। এখনও কোনো কাজ দেয়নি আমার ছেলেকে। তাই মতিউরকে একদিন বাড়িতে ডেকে এনে প্রমাণ হিসেবে স্ট্যাম্পে লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর ট্রেনের ঘটনা কী সেটি আমার জানা নেই। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
গত রোববার (১৮ মে) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মোবাইল চোর আখ্যা দিয়ে মতিউরকে চলন্ত ট্রেনের দরজা দিয়ে টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টার ঘটনা ঘটে। বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার নশরৎপুর স্টেশনে বগুড়া থেকে সান্তাহার অভিমুখী একটি কমিউটার ট্রেনে এই ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রেনের দরজার বাইরে ঝুলছেন মতিউর রহমান। কিন্তু ট্রেনের ভেতর থেকে কেউ তার হাত ধরে রেখেছিল। প্রাণে বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছিল লোকটি। একসময় ভেতর থেকে লোকটির হাত ছেড়ে দিলে তিনি পড়ে যান। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে অনেকেই মতিউরকে চোর এবং ছিনতাইকারী বলে দাবি করছেন।
এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মতিউরের পরিবারের সদস্যসহ স্থানীয়রা জানান, ঢাকার এক এজেন্সির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর কাজ করেন মতিউর। তারই ধারাবাহিকতায় সজীবকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সৌদি আরবে গিয়ে সজীবের বৈধ কাগজপত্র পেতে দেরি হওয়ায় তার পরিবারের সদস্যরা ৭-৮ দিন আগে মতিউরের বাড়িতে গিয়ে কাগজপত্রের বিষয়ে জানতে চায়। এর আগেও একবার মতিউরকে ডেকে নিয়ে গিয়ে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে নেয় সজীবের পরিবারের সদস্যরা। এ নিয়ে ঝামেলার সৃষ্টি হয়। এরই জের ধরে ট্রেনে মতিউরকে একা পেয়ে সজীবের শ্যালক ও তার সঙ্গে থাকা লোকরা মোবাইল চোর এবং ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে মতিউরকে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তার কাছে থেকে ৫০ হাজার টাকাও ছিনিয়ে নেয়।
মতিউর রহমানের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সৌদি আরবে ভালোভাবেই সজীবকে পাঠিয়েছি। কিন্তু সেখানে চাকরি না পাওয়ার কারণে তাদের ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এরই জের ধরে মেয়ের বাড়ি বগুড়া থেকে ট্রেনে বাড়িতে ফেরার পথে সজীবের শ্যালক সুমনসহ ৭-৮ জন আমাকে চোরের অপবাদ দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। মোবাইল চোর বলে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় খুব কষ্ট করে প্রায় ৪-৫ মিনিট ট্রেনের সঙ্গে ঝুলে ছিলাম। আমার কাছে ব্যবসায়িক কাজের ৫০ হাজার টাকা ছিল। সেটিও তারা কেড়ে নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এক পর্যায়ে ট্রেনটি আদমদীঘি উপজেলার নশরৎপুর স্টেশনে এলে সেখানকার প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ট্রেনের নিচে পড়ে যাই। এরপর কী হয়েছিল আর বলতে পারব না। তবে বেঁচে আছি এর জন্য অনেক শুকরিয়া। আমি তাদের উপযুক্ত বিচার চাই।
বাবার ছেঁড়া ও রক্ত মাখা প্যান্ট হাতে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মেয়ে মুনিকা খাতুন জানায়, আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি বাবা বেঁচে থাকার জন্য। আমার বাবার কিছু হলে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগত আমার। কারণ বাবা আমার বাড়ি থেকেই ফিরছিল। আমার বাবার সঙ্গে যারা এ রকম করেছে তাদের উপযুক্ত বিচার চাই।
মতিউর রহমানের ছেলে আহসান হাবিব বলেন, আমার বাবার মোবাইল ফোন থেকে ফোন আসে। এরপর জানানো হয় আমার বাবার অবস্থা খুব খারাপ। সঙ্গে সঙ্গে স্টেশনে গেলে একজন জানান আমার বাবা চোর। চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে এ রকম অবস্থা হয়েছে। তারপর আমরা ঢাকার অফিসসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে প্রমাণ দিলে তারা একসময় বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় যে আমার বাবা নির্দোষ। আমার বাবার সঙ্গে যারা এ রকম করেছে তাদের উপযুক্ত বিচার চাই। আমার বাবা সত্য পথে থাকার জন্যই তাকে আল্লাহ নিজ হাতে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।
সময়ের আলো/এমএইচ