বরিশালে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশে ঈদের জামাত আদায় করতে পেরে শুকরিয়া জানিয়েছেন মুসল্লিরা।
ঈদের দিন সকাল সাড়ে ৭টায় নগরীর বান্দ রোডের হেমায়েত উদ্দিন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে ইমামতি করেন কালেক্টরেট জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা আবদুল্লাহ আল মামুন। সকাল থেকেই ঈদ জামাতে অংশ নিতে দলে দলে ঈদগাহ ময়দানে প্রবেশ করতে শুরু করেন মুসল্লিরা। বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার, জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেনসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রধান জামাতে অংশগ্রহণ করেন। পরে মোনাজাতে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করা হয়। নামাজ শেষে পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন মুসল্লিরা। প্রধান ঈদ জামাত ঘিরে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়াও নগরীর ৫০০ মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈদের দিন দুপুরের মধ্যেই কুরবানির জবাইকৃত পশুর বর্জ্য অপসারণকাজ শুরু করা হয়।
পবিত্র ঈদুল আজহার পশু কুরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করে প্রশংসিত হয় বরিশাল সিটি করপোরেশন। ঈদের দিন শনিবার দুপুর ২টার দিকে নগরীর বগুড়া রোড এলাকা থেকে শুরু হয় বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম। এর আগে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে পশু জবাইয়ের জন্য ২০২টি স্পট নির্ধারণ করে দেয় বরিশাল সিটি করপোরেশন। দুপুর ২টা থেকে শুরু করে রাত ৮টার মধ্যে কুরবানির সব বর্জ্য অপসারণ করেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৭০০ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী এই কাজে অংশ নেন। মোট ২৫টি ময়লার ট্রাক, ৪টি লোডার ও ২টি পানির ট্রাকের মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণের কাজ করা হয়। এরপর ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে ও পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় নগরীর সড়কগুলো। একই সঙ্গে আগে থেকেই প্রতিটি ওয়ার্ডে বর্জ্য রাখার জন্য ৫০০টি করে বস্তা ও ৫০ কেজি করে ব্লিচিং পাউডার পাঠানো হয়েছিল বলে জানান বিসিসির কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার বলেন, এ বছর বরিশাল সিটি করপোরেশন আগে ভাগেই কুরবানি-দাতাদের বাড়িতে ব্যাগ ও ব্লিচিং পাউডার সরবরাহ করে। যার ফলে শহর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার আরও বলেন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা দুপুর থেকেই সব বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু করেন।
এদিকে পবিত্র ঈদুল আজহার পশু কুরবানি শেষে ঈদের দিন বিকাল থেকে বরিশালে চামড়া সংগ্রহ শেষে শুরু হয় বিক্রির কার্যক্রম। চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা শঙ্কা প্রকাশ করলেও এ বছর যারা চামড়া বিক্রি করতে আসেন তারা ভালো দাম পাচ্ছেন বলে জানান। গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রকারভেদে চামড়ার দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শনিবার বেলা আনুমানিক ৩টা থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে চামড়া সংগ্রহ শুরু করা হয়। পরে সংগ্রহ করা চামড়া নগরীর মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন স্থানীয় চামড়া বিক্রেতারা।
চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করতে আসা ব্যক্তিরা বলেন, গত বছরে তুলনায় এ বছর চামড়ার দাম বেড়েছে। সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে সেই দামেই চামড়া বিক্রি করতে পেরেছেন তারা। এ বছর সিন্ডিকেট না থাকায় চামড়ার ভালো দাম পেয়ে খুশি বিক্রেতারা। অন্যদিকে মৌসুমি চামড়া বিক্রেতারা জানান, বেশির ভাগ চামড়াই এবার মাদরাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে দান করেছেন কুরবানি-দাতারা। কিন্তু চামড়ার আড়তদারদের কাছে গিয়ে ভালো দাম পাননি তারা। প্রকার ভেদে চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে কিনে নিয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। আবার ভালো মানের ও লবণ দেওয়া চামড়া ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে।
মৌসুমি ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান মাসুম অভিযোগের সুরে জানান, আড়তদারদের কাছে তাদের পূর্বের বকেয়া রয়েছে। মালিকরা তাদের বকেয়া পরিশোধ করছে না। তারপরও এ বছর বরিশাল মহানগরীতে ৫০ হাজার চামড়া সংগ্রহ করা যাবে বলে আশা করেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে ঈদ কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে মানুষের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। ঈদুল আজহার দিনে বরিশালের বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করেন বিনোদনপ্রেমীরা। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে যান বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে। ঈদের দিনে বিকাল থেকেই নগরীর প্ল্যানেট পার্কসহ বিভিন্ন বিনোদন স্পটে দেখা গেছে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। ঈদ উপলক্ষে এই প্ল্যানেট পার্ককে সাজানো হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। পার্কের টিকেট কাউন্টারে দেখা যায় দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইন। পার্কের প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ধরা হয় ৩০ টাকা। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকেই প্ল্যানেট পার্ক খুলে দেওয়া হয় জনসাধারণের জন্য। রাত ৯টা পর্যন্ত এই পার্কে প্রবেশ করার সুযোগ রয়েছে। সকালে তেমন একটা ভিড় না থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থেকে বিনোদনপ্রেমী মানুষের ভিড়। পার্কে ৮টি রাইড রয়েছে যেগুলোতে সব বয়সের মানুষ চড়তে পারে। হাইড্রোলিক প্লেন, ফ্লাওয়ার বক্স, শান্তা মারিয়া, ঘোড়া, সুপার চেয়ার, ট্রেন, প্যাডেল বোট এবং প্যারা টুকাবর রাইডে উঠে আনন্দে মেতে ওঠে মানুষ। ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে পার্কে ঘুরতে এসে ভীষণ আনন্দ করেন বিনোদনপ্রেমীরা। প্ল্যানেট পার্ক ছাড়াও বরিশাল মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, বেলস পার্ক এবং ত্রিশ গোডাউন এলাকায় ঘুরতে যান অনেকে। ঈদে বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সময়ের আলো/এমএইচ