মুখে বাঁশি আর হাতে পতাকা নিয়ে প্রতিদিন রেলগেটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ৪৬ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী নিয়ন কুমার দাসকে। নাটোর রেল স্টেশনের টি ফিফটি সিক্স রেলগেট সুদীর্ঘ ২৫ বছর ধরে স্বেচ্ছাশ্রমে নীরবে পাহারা দিয়ে চলেছেন তিনি। ট্রেন আসা-যাওয়ার সময়টায় যানজট নিরসন আর সাধারণ মানুষের পারাপারে সহায়তা করা তার নিত্যদিনের কাজ। তাকে এই কাজ থেকে বিরত থাকতে বললে শুরু করেন কান্নাকাটি। এ কারণে তাকে কেউ বাধা দেয় না, নিষেধও করে না। তার এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় গেটম্যানরাও খুশি। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তার নিয়মিত ডিউটি ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে তার ভূমিকা স্থানীয়দের কাছে প্রশংসিতও হয়েছে।
জানা যায়, নাটোর সদর উপজেলার জঙ্গী প্রাইমারি স্কুল পাড়ায় নিয়ন কুমার দাসের বসবাস। বাবা নারায়ণ চন্দ্র দাস পেশায় ছিলেন পুরোহিত। ছয় বছর আগে মারা যান তিনি। দুই ভাই-বোনের মধ্যে নিয়নই বড়। দুই চোখের আলো ছাড়াই জন্ম হয়েছিল তার। জন্মের সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দুবার চোখের অপারেশন করা হয় তার। যখন তার ১৫ বছর বয়স তখন কলকাতায় গিয়ে চোখের চিকিৎসা নেওয়ার সময় মস্তিষ্কে জটিলতা দেখা দেয়। সেই থেকে আজও তিনি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীই রয়ে গেছেন। পরবর্তী সময়ে স্থানীয়ভাবে তার চোখের অপারেশন করা হয়। ১ হাজার ১০০ পাওয়ারের ভারী চশমা দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখতে পেলেও তার মাথার অসমাপ্ত চিকিৎসার কারণে আজ তিনি প্রতিবন্ধী। তবে তার কথা আর কাজে বোঝার উপায় নেই যে, তিনি একজন প্রতিবন্ধী। ছেলের চিকিৎসা করতে গিয়ে জমিজমা বিক্রি করতে হয়েছে বাবাকে। এখন বসতবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই নিয়নের পরিবারে। স্থানীয় সমাজসেবা অফিস থেকে সামান্য ভাতা দিয়ে তার চিকিৎসার খরচই চলে না। ১৫ বছর আগে তার মা বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিপি) থেকে অগ্রিম অবসর নিয়ে এককালীন যে টাকা হাতে পেয়েছিলেন তা ব্যাংকে রেখেছিলেন। ব্যাংক থেকে এখন যে আয় আসে তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে তাদের। বর্তমানে নিয়নের বৃদ্ধা মা শ্রীমতী সুনিতা রানী দাস ও নিয়ন একসঙ্গে বাস করছেন।
সরেজমিন কথা হয় শ্রীমতী সুনিতা রানী দাসের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশন ছুটে চলে নিয়ন। যখন বাড়িতে ফিরতে দেরি হয় তখন আমার দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। আমি প্রায়ই লুকিয়ে চোখের জল ফেলি। ভাবি আমি আর কতদিন বাঁচব। আমি না থাকলে শেষ বয়সে আমার ছেলের কী হবে। আমার ছেলের হাত খরচ যোগাবে কে। আমার এই আর্তনাদ সরকারের কাছে কি পৌঁছাবে। সরকার কি আমার ছেলের দায়িত্ব নেবে। নিয়নের মা সুনিতা রানী দাস আরও বলেন, নিয়ন প্রায় ২৫ বছর ধরে স্টেশনে গেটম্যান হিসেবে কাজ করে। সকাল হলেই সে ছুটে চলে যায়। যাওয়ার সময় আমার কাছ থেকেই থেকেই গাড়ি ভাড়া আর পকেট খরচের টাকা নিয়ে যায়। আমার খুব কষ্ট। শেষ বয়সে এসে কিছু চাওয়ার নাই। সরকার যদি আমার ছেলের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করে তা হলেই আমি সন্তুষ্ট।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে স্টেশন মাস্টার রেজাউল মল্লিক বলেন, আমার স্টেশনের তিনজন গেটম্যানসহ অন্যান্য কর্মীরা কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নিয়ন নামে যিনি গেটে কাজ করেন তিনি আমার স্টেশনের নিয়োগপ্রাপ্ত কেউ না। তারপরও তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর ধরে। তিনি গেটেই থাকেন, সেখানেই খান।
নিয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোর রেল স্টেশনের গেটম্যান মো. শরিফুল বলেন, আমি প্রথম দিন কাজে এসে দেখি, বাঁশি ফুঁ দিয়ে আর পতাকা উড়িয়ে গেটম্যানের কাজ করছেন নিয়ন। এসব দেখে তাকে এখানে আসতে নিষেধ করি এবং কাজ করা থেকে বিরত থাকতে বলি। এটা শুনে তিনি খুব কান্নাকাটি শুরু করেন। দেয়ালের সঙ্গে মাথা ঠুকে নিজেকে আঘাত করতে থাকেন। এসব দেখে পরে আর কিছু বলিনি তাকে। এখন আমি বাড়ি থেকে খাবার আনলে তার জন্যও আনি। একসঙ্গে বসে সেই খাবার খাই।
স্থানীয় এক চা বিক্রেতার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নিয়ন প্রায় ২৫ বছর ধরে রেলওয়ে গেটম্যান হিসেবে মানুষের কল্যাণে স্বেচ্ছাশ্রমে এই কাজ করে চলেছেন।
শুধু তাই নয়, কোনো যাত্রী ট্রেনসম্পর্কিত কোনো তথ্য চাইলে নিয়ন তার নিজের মোবাইল ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিয়ে সেই তথ্য জানিয়ে দেয়।
এএডি/