একটা সময়ে শীত মানেই ছিল ভোরের কুয়াশা ভেদ করে খেজুর রসের মিষ্টি ঘ্রাণ। কাকডাকা ভোরে খেজুর গাছে উঠে গাছির রস সংগ্রহ, গাছে ঝুলে থাকা মাটির হাঁড়ি আর ভোরবেলায় ধোঁয়া ওঠা চুলায় খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানানোর দৃশ্য- এসবই ছিল শ্রীপুরের শীতের চেনা ছবি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। শিল্পায়ন, পরিবেশগত পরিবর্তন ও পেশাগত সংকটে খেজুর গাছ যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে গাছিরাও। তবু সব প্রতিকূলতার মাঝেও গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কিছু এলাকায় এখনও কয়েকজন গাছি শতবর্ষের এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। একসময় শীত এলেই শ্রীপুরের গ্রামগুলোতে খেজুরের রস সংগ্রহ ছিল নিত্যদিনের চিত্র। এখন খোলা মাঠ কিংবা বাড়ির আঙিনায় অস্থায়ী চুলায় বড় কড়াই বসিয়ে সীমিত পরিসরে রস জ্বালিয়ে গুড় বানানোর দৃশ্য খুব কম জায়গায় চোখে পড়ে। যেখানে দেখা যায় সেখানেই যেন শীতের হারিয়ে যাওয়া সময়টা খানিকটা ফিরে আসে।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, খেজুর গাছ শুধু একটি ফসল নয়, এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও স্থানীয় অর্থনীতির অংশ। শিল্পায়ন ও অব্যবস্থাপনার কারণে খেজুর গাছ কমেছে। কৃষি বিভাগ মানুষকে খেজুর গাছ লাগাতে উৎসাহিত করছে। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ এবং সহায়তাও দেওয়া হবে। এখনই উদ্যোগ না নিলে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বরমী ইউনিয়নের ভিটিপাড়া গ্রামের গাছি মোতালেব মিয়া ভোর থেকে চুলায় আগুন ধরান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কড়াইয়ের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া আর গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ। তিনি বলেন, খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানানো সহজ কাজ না। ফজরের নামাজের পরপরই গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে দীর্ঘসময় আগুন জ্বালিয়ে কড়াই নেড়ে রস ঘন করতে হয়। কিন্তু গাছ কমে গেছে, রসও কম। লাভের চেয়ে কষ্টই বেশি। খেজুর গাছ কমে যাওয়া, গাছির সংকট, জ্বালানি কাঠের দাম বৃদ্ধি এবং আধুনিক পেশার প্রতি মানুষের ঝোঁক সব মিলিয়ে এই পেশা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
শ্রীপুরের বরমী ইউনিয়নের সাতখামাইর গ্রামের ইউপি সদস্য মো. রনি আকন্দ স্মৃতিচারণ করে বলেন, আগে শীত এলেই ভোর থেকে রসের ধুম পড়ত। হাঁড়ি ভর্তি রস নিয়ে মানুষ কাঁচা রস খেত, গাছিরা জ্বাল দিয়ে গুড় বানাত। এখন আগের মতো গাছও নেই, গাছিও নেই। তাই সেই শীতের আমেজ আর ফিরে আসে না।
উপজেলার মাওনা এলাকায় দেখা যায় আরেক বাস্তবতা গাছ আছে, কিন্তু গাছি নেই। মাওনা ইউনিয়নের বাসিন্দা আতাউর সরকার ও তৈয়ব হোসেন খান জানান, অনেক জায়গায় খেজুর গাছ থাকলেও গাছি পাওয়া যায় না। তাই নিজেরাই গাছ কেটে রস সংগ্রহ করেন যাতে শীতের এই মিষ্টি স্বাদ থেকে তারা ও আশপাশের মানুষ বঞ্চিত না হন। শিল্পায়নের প্রভাব নিয়ে তেলিহাটী ইউনিয়নের স্কুল শিক্ষক মো. সেলিম খান বলেন, শিল্পায়নের কারণে খেজুর গাছ দ্রুত কমে যাচ্ছে। বাজারে চাহিদা থাকলেও রস পাওয়া যায় খুব কম। এখনই খেজুর গাছ লাগানোর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খেজুরের রস চিনবে শুধু বইয়ের পাতায়। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় অন্তত একটি করে খেজুর গাছ লাগানো প্রয়োজন।
নতুন প্রজন্মের মাঝেও খেজুরের রসের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। স্থানীয় যুবক জাহিদ হাসান বাপ্পি বলেন, খেজুরের রস আর রসের গুড়ের স্বাদই আলাদা। শীত মানেই খেজুরের রস আর গুড়। কিন্তু এখন আগের মতো সহজে পাওয়া যায় না। যেখানে রসের খবর পাই, সেখানেই ছুটে যাই।
এএডি/